প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 11 May 2026, 12:24 AM
কুমিল্লা সদরের দুর্গাপুরে প্রবাসীর নির্মানাধীন বাড়ি দখল ও লুটপাট
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর পশ্চিম পাড়া এলাকায় এক সৌদি প্রবাসীর নির্মাণাধীন বাড়ি জোরপূর্বক দখল, নির্মাণ সামগ্রী লুটপাট এবং পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে স্থানীয় জামায়াত নেতা তৈয়ব আলী ও তার শ্যালক ইসমাইলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, আদালতের একাধিক রায় ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে জমির দখল বুঝে পাওয়ার পরও রাজনৈতিক প্রভাব ও সন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহার করে তাদের বসতভিটা দখল করা হয়েছে।
এ ঘটনায় দীর্ঘদিনেও কোনো কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে প্রবাসী আলমগীর হোসেনের পরিবার। পরিবারটির অভিযোগ, বাড়ি উদ্ধারের চেষ্টা করলে মিথ্যা মামলা, এসিড নিক্ষেপ, হত্যার পর লাশ গুমসহ নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ফলে পরিবারটির সদস্যরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
সৌদি প্রবাসী আলমগীর হোসেনের স্ত্রী নাসরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৫ মার্চ কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, অভিযুক্তরা তাদের দীর্ঘদিনের বসতভিটা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে এবং পরিবারটিকে নানাভাবে হয়রানি করছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়নের মৌজা দুর্গাপুর, জে.এল নং-০২৩ এর খতিয়ানভুক্ত একটি বসতভিটার জমি নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা চলে আসছিলো। ওই জমির মালিক ছিলেন নাসরিন আক্তারের শ্বশুর। প্রায় ১৭ বছর আগে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আদালত জমির মালিকানা তাদের পক্ষেই ঘোষণা করেন। পরে বিবাদীপক্ষ উচ্চ আদালতে গেলেও সেখানেও তাদের আবেদন খারিজ হয়ে যায় এবং নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকে।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আদালতের নির্দেশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের উপস্থিতিতে জমির দখল তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে জমির নামজারি, খারিজ, খতিয়ান সংশোধনসহ সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র সম্পন্ন করা হয় এবং নিয়মিত সরকারি খাজনাও পরিশোধ করে আসছেন তারা। এরপর তারা ওই জমিতে মাটি ভরাট, সংস্কার ও ভবন নির্মানের কাজ শুরু করেন।
পরিবারটির দাবি, আদালতে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই তৈয়ব আলী তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এরপর থেকেই একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি শুরু করেন। বিভিন্ন মামলায় আদালতে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও হয়রানি বন্ধ হয়নি। বরং সুযোগ পেলেই ভয়ভীতি, হুমকি ও সামাজিকভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা চালানো হয়।
নাসরিন আক্তার অভিযোগ করেন, গত বছরের ৬ আগস্ট বিকেলে তৈয়ব আলী, তার শ্যালক ইসমাইল এবং তাদের নেতৃত্বাধীন একদল সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় তারা বাড়ির বাউন্ডারি ওয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে পরিবারের সদস্যদের মারধরের ভয় দেখিয়ে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, আমাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। তারা বাড়িটি জোর করে দখল করে নেয়। নির্মাণাধীন ভবনের প্রায় পাঁচ হাজার ইট, বালু, রড, সিমেন্টসহ ১০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এছাড়া বাড়ির বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছ কেটে ফেলে।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, কয়েক বছর ধরে সৌদি প্রবাসী আলমগীর হোসেন কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে ওই জমিতে একটি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ভবনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই জামায়াত নেতা এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাড়িটি দখল করে নেয়।
নাসরিন আক্তার আরও বলেন, আমার স্বামী দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সৌদি আরবে আছেন। তিনি কষ্ট করে টাকা পাঠিয়ে বাড়ি নির্মাণ করছিলেন। কিন্তু এখন সেই বাড়িতেই আমরা ঢুকতে পারি না। আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মিথ্যা মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে। আমাকে এসিড দিয়ে মুখ ঝলসে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সন্তানদের হত্যা করে লাশ গুম করার ভয়ও দেখানো হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বাড়িটি দখল করার পর অভিযুক্তরা সেখানে টিন দিয়ে বাউন্ডারি তৈরি করে পুরো এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। বর্তমানে তারা ওই বাড়িতে অবস্থান করছে। ভয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটি শ্বশুরের পুরোনো টিনের ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
পরিবারটির দাবি, ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, সমাজপতি ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। সালিশে অভিযুক্ত তৈয়ব আলীর মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে চার লাখ টাকা দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়।
স্থানীয় সমাজ পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সালিশের বিচারক মোহাম্মদ মোরশেদ আলম বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবার আমাদের কাছে বিচার নিয়ে আসে। আমরা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করি। সালিশে সিদ্ধান্ত হয় যে, সামাজিক সমাধানের অংশ হিসেবে তৈয়ব আলীকে কিছু অর্থ দেওয়া হবে এবং তিনি বাড়ি ছেড়ে দেবেন। প্রবাসী পরিবারও সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।”
তিনি আরও বলেন, “পরবর্তীতে তৈয়ব আলী বাড়ি ছাড়েননি। তাকে কাগজপত্র নিয়ে একাধিকবার বসতে বলা হলেও তিনি আসেননি। পুলিশ প্রশাসনও তাকে ডেকেছে, কিন্তু তিনি যাননি। তিনি সমাজের কোনো সিদ্ধান্ত মানেন না। আদালতের রায়ও অমান্য করছেন।”
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি ও স্থানীয় সালিশকারী লিটন মিয়া বলেন, “আলমগীর হোসেন দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় বাড়িতে পুরুষ সদস্য নেই। সেই সুযোগে তাদের বাড়ি দখলের ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি। সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্ত পক্ষ পরে সেই সিদ্ধান্ত মানেনি। এখন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া বিষয়টির সমাধান সম্ভব নয়।”
স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বিষয়টি আমি শুনেছি। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অন্যের সম্পত্তি দখল বা লুটপাটের সুযোগ নেই। বিএনপি বা জামায়াত—যে দলেরই হোক, অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা হওয়া উচিত। প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা।”
এদিকে সৌদি প্রবাসী আলমগীর হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, “আমি প্রায় ৩০-৩৫ বছর ধরে সৌদি আরবে আছি। পরিবারের সুখের জন্য কষ্ট করে টাকা উপার্জন করেছি। দেশে বাড়ি করেছি। অথচ আজ আমার স্ত্রী-সন্তান নিরাপদ নয়। প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হয়। ফোনে স্ত্রী-সন্তানদের কান্না শুনে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। আমার স্ত্রীকে হত্যা, এসিড নিক্ষেপ, ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং আদালতের রায় অনুযায়ী আমার বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হোক।”
থানায় দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে গালিগালাজ, ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছে। এমনকি বর্তমানে যে পুরোনো টিনের ঘরে পরিবারটি আশ্রয় নিয়েছে, সেই ঘরেও আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে দাবি তাদের। পরিবারটির সদস্যরা এখন যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত তৈয়ব আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) জহির উদ্দিন বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করি। এ নিয়ে অভিযুক্ত তৈয়ব আলীকে একাধিকবার থানায় ডাকা হলেও তিনি উপস্থিত হননি। পরবর্তীতে বিষয়টি থানার ওসিকে অবহিত করা হয়। ওসি সাহেবও তাকে যোগাযোগ করে আসতে বলেছিলেন, কিন্তু সেখানেও তিনি সাড়া দেননি। স্থানীয়ভাবে সামাজিক সালিশের সিদ্ধান্তও তিনি মানেননি। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, ‘আপনারা আপনাদের ব্যবস্থা নিন, আমি আদালতেই বিষয়টি মোকাবিলা করবো।’ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, আদালতের রায় ও প্রশাসনিক দখল বুঝিয়ে দেওয়ার ১৭ বছন পরও যদি কোনো পরিবার নিজেদের বাড়িতে নিরাপদে থাকতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হবে। তারা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
পে স্কেলের রূপরেখা চূড়ান্ত, সভায় এলো যেসব সিদ্ধান্ত
জনপ্রশাসন সংক্রান্ত পে কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে নবম পে স্কেলের নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়...
ভেনেজুয়েলায় পরপর শক্তিশালী ভূমিকম্প, ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্...
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় পরপর দুইটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার...
নাঙ্গলকোটে বোনের হাতে ভাই খুন
নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে তুচ্ছ ঘটনায় বোন, ভাগিনা ও ভগ্নিপতির হামলায়...
খোলা ও ভাঙা ড্রেন আর নয়: ২৭ ওয়ার্ডে নতুন আরসিসি স্ল্যাব বসাচ...
আয়েশা আক্তার।। কুমিল্লা নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে কু...
হোমনায় অনলাইন জুয়ায় ২২ লাখ টাকা খুইয়ে প্রবাসীর আত্মহত্যা
মো. আবুল বাসার সরকার অনলাইন জুয়ায় বিপুল...
কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় ও দোয়া
নিজ¯^ প্রতিবেদককুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় ও দোয়া অনুষ্ঠান কলেজ...