মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ সময়ের দাবি
একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। আর সেই শিক্ষার প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। শিশুর মানসিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো প্রাথমিক স্তর। তাই একটি দক্ষ, সচেতন ও মানবিক জাতি গঠনের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠনে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এ কারণে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বলতে এমন শিক্ষাব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে শিশুর জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি তার সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও বাস্তবজীবনের দক্ষতা বিকশিত হয়। শুধু বইভিত্তিক শিক্ষা নয়, বরং আনন্দময় ও কার্যকর শিক্ষার পরিবেশই মানসম্মত শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষকরা হলেন এই মেরুদণ্ড গড়ার কারিগর। এই শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কেননা এসময়ে শিশুরা থাকে কাঁদা মাটির মতো যাতে যেকোনো আকৃতি বা শেপ দেওয়া সম্ভব। তাই এসময় শিক্ষার্থীদের ভেতরে মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে এবং সঠিক জ্ঞানদানের মাধ্যমে একটি আদর্শ ও আলোকিত জাতি গঠনে শিক্ষকরা প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারেন।
বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান, বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালু, শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন স্কুল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন, পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানো এবং সুষ্ঠু ব্যবস্হাপনা ইত্যাদি উদ্যোগ প্রশংসনীয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্হা এখন বিভিন্ন সংস্কৃতি ও আর্থসামাজিক অবস্থান থেকে উঠে আসা ও নানা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সক্ষম শিশুদের চাহিদার প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী। শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরা এখন মূলধারার স্কুলে ভর্তি হতে ও শিক্ষা নিতে পারছে। তবে এখনও অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাব, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সীমিত সুযোগ রয়েছে। এছাড়া গ্রাম ও শহরের শিক্ষার মানেও বৈষম্য লক্ষ করা যায়।
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজ - সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরা হলো:
দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। বিদ্যালয়ে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে।
শিশুদের জন্য আনন্দময় ও শিশুবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে। নিয়মিত তদারকি ও শিক্ষার মান মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি তথা বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। শহর ও গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য দূর করতে হবে।শিখন ঘাটতি দূরীকরণ। শিক্ষার্থীর প্রতি ব্যক্তিগত যত্ন নিতে হবে।
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া একটি জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ, তাই তাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার। সরকার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
লেখক
মাহমুদা জাহান
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা।
ক্যাটেগরি:
বৃহত্তর কুমিল্লা
ট্যাগ:
বৃহত্তর কুমিল্লা
জাতীয়
আন্তর্জাতিক
রাজনীতি