স্টাফ রিপোর্টার
কুমিল্লা সদর উপজেলার ১নং কালীর বাজার ইউনিয়নের কামাইরবাগ গ্রামে জমি বিক্রির অধিকাংশ টাকা গ্রহণ করার পর পুনরায় সেই জমি দখলে নিতে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে বিক্রয়দাতার ছেলে মাসুদ আলম ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পুলিশ মাসুদ আলম ও তাঁর সহযোগী এবাদুলকে গ্রেফতার করেছে বলে জানায়।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে কামাইরবাগ গ্রামের বাসিন্দা কাতারপ্রবাসী রাসেল আহমেদ তাঁর মায়ের নামে একই গ্রামের মৃত মাজেদুল ইসলামের কাছ থেকে ৯ শতাংশ জমি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ক্রয় করেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত মাজেদুল ইসলাম চিকিৎসা ব্যায়ের জন্য ধাপে ধাপে রাসেলের কাছ থেকে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি জমিটি দলিল করে দিতে পারেননি।
ভুক্তভোগী কাতারপ্রবাসী রাসেল আহমেদ জানান, মাজেদুল ইসলাম অত্যন্ত সহজ-সরল ও ভালো মানুষ ছিলেন। বিশ্বাসের সম্পর্কের কারণে শুরুতে তিনি কোনো কাগজপত্র ছাড়াই টাকা দেন। পরে মাজেদুল ইসলামের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে-মেয়েরা বিষয়টি অবগত ছিল এবং দলিল সম্পন্ন করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আরও তিন লাখ টাকা দাবি করে। পরে একটি বায়নাপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে রাসেলের কাছ থেকে আরও দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, যে জমিটি তিনি ক্রয় করেন সেটি অনেক নীচু জমি ছিল। পরে নিজ খরচে জমিটি ভরাট করে সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও গেট স্থাপন করেন। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এ নিয়ে কারও কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু পরে দলিল চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ শুরু হয়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি যখন তাদের কাছে দলিল চাই, তখন থেকেই তারা বিভিন্ন অজুহাতে আরও টাকা দাবি করতে থাকে। এরপর পরিকল্পিতভাবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের ভয়ভীতি ও নির্যাতন করা হচ্ছে। ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। এখন আরও টাকা দাবি করছে। আমি দলিল চাওয়াতে তারা এলাকার সন্ত্রাসী শরীফ ও তার কিশোর গ্যাং বাহিনী দিয়ে আমাদের পরিবারের ওপর হামলা করে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১৪ মে মাসুদ আলম, শরীফ, এবাদুল হক, ইউনুছ, ছোটন, মহসিন, সোহাগ ও জুয়েলসহ একদল লোক রাসেল আহমেদের ক্রয়কৃত জমিতে হামলা চালায়। তারা মূল গেটের তালা ভেঙে জোরপূর্বক জমির ভেতরে প্রবেশ করে। পরে দক্ষিণ পাশের দেয়াল ভেঙে সেখানে নতুন গেট নির্মাণ করে তালা লাগিয়ে দেয়।
এ সময় বাধা দিতে গেলে রাসেলের মা হাসিনা আক্তারসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে কয়েকজন আহত হন।
ঘটনার পর হাসিনা আক্তার বাদী হয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তবে মামলা দায়েরের পরও অভিযুক্তদের তৎপরতা থেমে নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।
রাসেল আহমেদ আরও বলেন, তারা এখন বলছে টাকা ফেরত নিয়ে জমি ছেড়ে দিতে। অথচ তিন বছর আগে নিজেরাই জমি বিক্রি করে টাকা নিয়েছে। এখন আবার সেই জমি অন্যত্র বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু জমি দখল করেই তারা থেমে থাকেনি। গতকাল রাত আনুমানিক ৩টার দিকে আমার বাড়ির একটি টিনশেড ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে আমাদের সেই ঘর পুরোপুরি পুরে ছাই হয়ে যায়। আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযুক্ত মাসুদ আলম ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কিশোর গ্যাং পরিচালনা, জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তারা গ্রেপ্তার হচ্ছে না বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযুক্তদের ভয়ে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। এলাকায় তাদের প্রভাব ও ভয়ভীতির কারণে অনেকে নীরবে সহ্য করছেন নানা হয়রানি।
রাসেল আহমেদের মা হাসিনা আক্তার বলেন, আমার ছেলের ক্রয়কৃত জমি তিন বছর ধরে আমাদের দখলে। ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে তারা। আমরা নিজ খরচে নিচু জমি ভরাট করে দেয়াল করেছি। এখন সন্ত্রাসী দিয়ে জোর করে দখল করতে আসছে। আমি বাধা দিতে গেলে তারা আমার ওপরও আক্রমণ করে। গতকাল রাত ৩টায় আমাদের বাড়ির টিনশেড ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ভুক্তভোগী পরিবার প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে।
মামলার দায়ীত্বে থাকা তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক জহিরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় আমরা একবার তদন্ত করেছি। তারপরেও আসামিরা আবার আগুন ধরিয়ে দিলে আজকে দুজনকে গ্রেফতার করি। গ্রেফতারকৃতরা হলেন মাসুদ আলম ও তাঁর সহযোগী এবাদুল।