কুবি প্রতিনিধি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিক্রি থেকে আয়কৃত অর্থ প্রশাসন, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করা হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি কোনো বরাদ্দ নেই। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। ভর্তি পরীক্ষার অর্থব্যয় কমিটি সূত্রে জানা যায়, চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিক্রি করে মোট ৯ কোটি ৬৮ লাখ ৭৫ হাজার ১৪০ টাকা আয় হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ৩ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার ৫৬ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) প্রদান করা হয়। অবশিষ্ট ৬০ শতাংশের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনে ব্যয় করা হয়েছে ৩ কোটি ৬৭ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৪ টাকা এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, আউটসোর্সিং ও দৈনিকভিত্তিক কর্মচারীদের সম্মানী বাবদ ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ১৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা। সম্মানীর বণ্টন অনুযায়ী উপাচার্য পেয়েছেন ৬ লাখ টাকা, উপ-উপাচার্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ট্রেজারার ৫ লাখ টাকা, রেজিস্ট্রার ৭০ হাজার টাকা এবং প্রক্টর ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া প্রতি শিক্ষক ৭৫ হাজার টাকা, প্রতি ইউনিটের আহ্বায়ক ৭০ হাজার টাকা এবং সদস্য-সচিব ৪০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন।
টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক পেয়েছেন ৩০ হাজার টাকা, সদস্যরা ২০ হাজার টাকা এবং সহায়তাকারীরা ৫ হাজার টাকা করে সম্মানী পেয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত হারে সম্মানী প্রদান করা হয়েছে। অনুষদভিত্তিক উপ-কমিটি ও অন্যান্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইকবাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'কতসুন্দর টাকা ভাগাভাগি করলেন, শিক্ষকরা তাদের বেতন পাওয়ার পরও মাত্র ১ ঘন্টার জন্য ৭০০০০ টাকা করে ভাগ করে নিলেন। কিন্তু হল ও ক্যাফেটেরিয়ার জন্য নূন্যতম ভর্তুকি নেই। আমরা শিক্ষার্থীরা যা তা খেয়ে কোনোরকম দিন পার করতেছি। জীবনের যুকি নিয়ে বাসে চলাচল করছি পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে আর আপনারা ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন।'
তিনি আরও লিখেন, 'শুনেছি টাকা ভাগের মিটিং এ একবার হলে ভর্তুকির বিষয়টা নিয়ো আলোচনা উঠেছিল কিন্তু সেখানে শিক্ষক নামের কলঙ্ক যারা তারা নাকি হলে ভর্তুকি দিতে রাজি না হয়ে টাকা ভাগ করে করে নিতে সম্মত হয়েছিলেন। এই আপনারাই যখন ক্লাসে নীতি নৈতিকতার কথা বলেন তখন শিক্ষার্থীদের হাসি পাওয়াটাই স্বাভাবিক।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, 'ভর্তি পরীক্ষার ফরম বিক্রি করে যে টাকা আয় হয় সেটার থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ সকলের পারিশ্রমিক নেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে সেটা শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া উচিত। আমারে ক্যাম্পাসে ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের নিম্নমান এবং হলগুলোতেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী হলের নিম্নমানের খাবারে কারণে বাহিরে খাবার খায়। প্রশাসন যদি শিক্ষার্থীবান্ধব হতো তাহলে এই টাকা থেকে কিছু অংশ হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দিতো।'
তিনি আরও বলেন, ' আমি এটার জন্য শুধু প্রশাসনকেই দোষ দিব না। কারণ এখানে সবার সম্মতিতে এই টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। তাই প্রশাসনের যেমন দোষ রয়েছে তেমনি সকল শিক্ষক, বিভিন্ন অনুষদের ডিনসহ সকলেই সমানভাবে দায়ী।'
এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, 'সবার সম্মতিক্রমেই এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি পরীক্ষার আয় থেকে শিক্ষকরা এর চেয়ে বেশি সম্মানী পান।'
শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বরাদ্দ আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ নেই বিষয়টি এমন নয়। পূর্বের তহবিল থেকে ২৬ মার্চ শিক্ষার্থীদের আপ্যায়ন করা হয়েছে এবং এবছর পহেলা বৈশাখে হলগুলোতে খাওয়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ইউজিসিতে দেওয়া টাকা ফেরত পেলে তা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে।'
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলী বলেন, 'ইউজিসির ভর্তিপরীক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী ৪০ শতাংশ অর্থ তাদেরকে প্রদান করতে হয় এবং বাকি অর্থ পরীক্ষা সংক্রান্ত ব্যয়ে ব্যবহার করা হয়। ব্যয় শেষে অর্থব্যয় কমিটির মাধ্যমে সম্মানী নির্ধারণ করা হয়।'
তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, তবে প্রতি বছরই এই প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে।'
তিনি আরও বলেন, 'যে ৪০ শতাংশ অর্থ ইউজিসিতে স্থানান্তর করা হয়েছে সে টাকা ফেরত আনার জন্য আমরা চিঠি দিয়েছি। টাকা ফেরত আসলে পুরো টাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।'
এদিকে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, 'নীতিমালা অনুযায়ী ৪০ শতাংশ অর্থ কমিশনের বাজেটের সাথে সমন্বয় করা হয় এবং বাকি অর্থ পরীক্ষা ব্যয়ে ব্যবহারের কথা। তবে এ অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করার অভিযোগ এসেছে বেশ করেকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'