প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 5 Jul 2026, 12:16 AM
আঞ্চলিক অর্থনীতির হৃদপিণ্ডে বর্জ্যের আঘাত বিলুপ্তির পথে ঐতিহাসিক কালাডুমুর নদী
চান্দিনা প্রতিনিধি
কুমিল্লার চান্দিনা, দাউদকান্দি, মুরাদনগর, দেবীদ্বার এবং চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলাসহ মোট পাঁচটি উপজেলার লাখো মানুষের প্রধান বাণিজ্যিক মোহনা ঐতিহাসিক ইলিয়টগঞ্জ বাজার| আর এই বিশাল আঞ্চলিক অর্থনীতির হৃদপিণ্ড ও প্রাণের উৎস ছিল যে জলধারা, আজ তা ধুঁকে ধুঁকে মরছে| ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই নদীটি একসময় 'খিরাই নদী' নামে পরিচিত ছিল| কালের বিবর্তনে পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন হয়ে 'কালাডুমুর নদী' (কালা ডোমর) হিসেবে পরিচিতি পায়| কিন্তু দুঃখজনক বাস্তব হলো, ইতিহাসখ্যাত এই কালাডুমুর নদকে আজ পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার নির্মম উৎসব চলছে!
ইলিয়টগঞ্জ বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেন মোল্লা, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. মনির হোসেন সহ একাধিক ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অতীতের স্মৃতি চারণ করে “ˆদনিক রুপসী বাংলাকে” জানান, কালাডুমুর নদের ইতিহাস এমন করুণ ছিল না| একসময় এই কালাডুমুর নদে ছিল প্রবল স্রোত| সিলেট থেকে বড় বড় নৌকা ও ট্রলার বোঝাই করে ধান নিয়ে আসতেন দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা| ইলিয়টগঞ্জ স্টিল ব্রিজের নিচে পানির স্রোতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, মালবাহী নৌকা ও ট্রলারগুলো ¯^াভাবিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারতো না| তখন নদীর পাড়ের গাছের সাথে শক্ত রশি বেঁধে স্থানীয় কয়েকজন মিলে টেনে টেনে অত্যন্ত কষ্ট করে সেই নৌকা ও ট্রলারগুলো পার করতে হতো! দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ইলিয়টগঞ্জ বাজারের ঘাটে লেগে থাকতো এমন শত শত নৌযানের উপচে পড়া ভিড়| নদীকেন্দ্রিক সেই নৌপথের ওপর ভিত্তি করেই একদিন জমে উঠেছিল এই ঐতিহাসিক ইলিয়টগঞ্জ বাজার| কিন্তু আজ সেই জমজমাট ঘাট উধাও, প্রমত্তা নদের বুক জুড়ে আজ কেবলই হাহাকার|
তারা বলেন, গোমতী নদীর প্রমত্তা শাখা কালাডুমুর নদের ˆদর্ঘ্য ও বিস্তৃতি বিশাল| গোমতীর গৌরীপুর উৎস থেকে ইলিয়টগঞ্জ বাজার পর্যন্ত যার ˆদর্ঘ্য ৪১ হাজার ৮৫০ ফিট বা প্রায় ১৩ কিলোমিটার, আর ইলিয়টগঞ্জ থেকে পতনমুখ পর্যন্ত আরও ১০ কিলোমিটার| অর্থাৎ, এই ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশাল জলপথটি আজ বাজার কমিটির প্রাতিষ্ঠানিক ডাম্পিং জোনে পরিণত হয়েছে| প্রতিদিনের শত শত টন প্লাস্টিক, পলিথিন আর পচনশীল বর্জ্য অবাধে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে নদের ওপর নির্মিত ব্রিজের ঠিক নিচে| দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই আবর্জনা এখন নদের বুকে এক বিশাল কৃত্রিম পাহাড়ে রূপ নিয়েছে, যা পানির ¯^াভাবিক প্রবাহকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেছে|
কালাডুমুর শুধু একটি জলপথই নয়, এটি এই অঞ্চলের কৃষির লাইফলাইন| এই নদের পানি দিয়ে সেচ কার্য পরিচালনা করে স্থানীয় কৃষকেরা আনুমানিক পঞ্চাশ হাজার বিঘা জমিতে প্রায় বার লক্ষ মণ বোরো ধান উৎপাদন করেন! আজ নদের পানি বর্জ্য আর কচুরিপানায় পচে কুচকুচে কালো ও বিষাক্ত হয়ে গেছে| বর্জ্যের পাহাড়ে পানিপ্রবাহ আটকে থাকায় এই বিশাল সেচ ব্যবস্থা ও কৃষি এখন চরম ধ্বংসের মুখে| একটি ঐতিহাসিক নদকে এভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করা হচ্ছে, অথচ নদটি পুনঃখনন এবং সুরক্ষার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাঝেই এক চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে| বর্জ্যের পচা দুর্গন্ধে পথচারী ও সাধারণ মানুষের দম আটকে আসছে, দূষিত পানিতে রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে, কিন্তু টনক নড়ছে না কারও|
নদটির এই মরণদশা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় কৃষি পদক ও জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত পরিবেশবিদ (এআইপি) এবং কালাডুমুর নদ রক্ষা আন্দোলনের মুখপাত্র অধ্যাপক মতিন ˆসকত| তিনি ‘ˆদনিক রুপসী বাংলার’- মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি ও উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন-"কালাডুমুর নদকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি| একসময়ের প্রমত্ত ও প্রাণবন্ত এই নদ আজ অবৈধ দখল, দূষণ, নির্বিচারে ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে| যে নদ একসময় এই অঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও জনজীবনের অন্যতম প্রাণস্রোত ছিল, আজ তা অনেক স্থানে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে|
তিনি আরও বলেন- কালাডুমুর নদ কেবল একটি জলধারা নয়; এটি আমাদের পরিবেশগত ভারসাম্য, কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য, জলসম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত| নদীর ¯^াভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে তার বিরূপ প্রভাব পুরো অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর পড়বে| আমরা গত ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কালাডুমুর নদ পুনঃখনন, পুনরুদ্ধার এবং স্থায়ী সুরক্ষার দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছি| আমাদের এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হলো নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অবৈধ দখলমুক্ত করা, দূষণ রোধ করা এবং নদীর প্রাকৃতিক অস্তিত্ব পুনরুদ্ধার করা| আমি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাই-অবিল¤ে^ অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণের উৎস বন্ধ, নদী থেকে ময়লা-আবর্জনা অপসারণ, প্রয়োজনীয় পুনঃখনন এবং নদীর ¯^াভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত, কার্যকর ও সমšি^ত পদক্ষেপ গ্রহণ করুন| মনে রাখতে হবে, নদী বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, কৃষি বাঁচবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং মানুষ নিরাপদ ভবিষ্যৎ পাবে| কালাডুমুর নদ রক্ষা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার ˆনতিক, সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ব| আসুন, দল-মত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কালাডুমুর নদ রক্ষার আন্দোলনে শামিল হই এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত, প্রবহমান ও দূষণমুক্ত নদী উপহার দিই|
নদীতে বর্জ্য ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে ইলিয়টগঞ্জ বাজার ম্যানেজিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক (সেক্রেটারি) মো. সেলিম রেজা ‘দৈনিক রুপসী বাংলাকে’ বলেন, নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে আমাদের প্রতিনিয়ত অনেক কথা শুনতে হচ্ছে| কিন্তু আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, স্রেফ পরিস্থিতির শিকার হয়েই বাধ্য হয়ে নদীতে ময়লা ফেলতে হচ্ছে| বাজারে উৎপাদিত বর্জ্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে সরকারিভাবে আমাদের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল| কিন্তু আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যখনই সেখানে ময়লা ফেলতে যান, তখনই স্থানীয় মাছ চাষিরা তাঁদের বাধা প্রদান করেন|
তিনি ঘটনার নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করে ‘দৈনিক রুপসী বাংলাকে’ আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসন আমাদের যে ডোবাটি ময়লা ফেলার জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল, দুঃখজনকভাবে দাউদকান্দি ভূমি অফিস সেই একই জায়গাটি আবার মাছ চাষিদের কাছে ইজারা (লিজ) দিয়ে ফেলেছে! তাদের ইজারার মেয়াদ থাকার কারণে আইনি জটিলতায় আমরা সেখানে বর্জ্য ফেলতে পারছি না| তবে কয়েক মাস আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন| তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে, মাছ চাষিদের দেওয়া ওই ইজারা বাতিল (ক্যান্সেল) করে জায়গাটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে| আমরা আশা করছি, এই প্রশাসনিক জটিলতা কেটে গেলে খুব দ্রুতই আমরা সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে পারবো এবং নদীতে বর্জ্য ফেলা পুরোপুরি বন্ধ হবে|
প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ এই সমš^য়হীনতা এবং লিজ জটিলতার কারণে ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ কালাডুমুর নদ আজ আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হওয়া প্রসঙ্গে জানতে দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরীন আক্তারের সরকারি মোবাইল ন¤^রে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি| পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপ ন¤^রে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ লিখিত বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি|
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
শিক্ষা-গবেষণায় বাস্তবমুখী জ্ঞানচর্চার তাগিদ কুবি উপাচার্যের
কুবি প্রতিনিধি :কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা’ শীর্ষ...
হোমনায় উচ্ছেদের পর ফের সড়ক দখল ভোগান্তিতে পথচারীরা
মো. আবুল বাসার সরকার কুমিল্লার হোমনা পৌরসভার বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত দ...
প্যারোলে মুক্তি পেলেন ডা. দীপু মনি
স্বামীর মৃত্যুতে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ড...
ব্রাহ্মণপাড়ায় সালিশে নারীকে জুতাপেটা, ইউপি চেয়ারম্যান বললেন-...
মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি।।কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়ন...
হোমনায় ৭ বছরের শিশুর উলঙ্গ লাশ উদ্ধার
হোমনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:কুমিল্লার হোমনায় আয়েশা বেগম (৭) নামে এক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে এলাকায়...
২৩ মামলার আসামী মাদক সম্রাট কসাই রুবেল ফের গ্রেফতার
ফয়সল আহমেদ খান, বাঞ্ছারামপুর ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার শ...