প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: আন্তর্জাতিক | প্রকাশ: 20 Aug 2026, 9:24 AM
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ছাড়াল ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার
শিব্বীর আহমেদ, ওয়াশিংটন ডিসি: যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দেশটির মোট জাতীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০.০৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক এবং দেশটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঋণের মধ্যে প্রায় ৩২.২৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার জনগণের হাতে থাকা সরকারি ঋণ এবং প্রায় ৭.৭৮২ ট্রিলিয়ন ডলার সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পারস্পরিক ঋণ বা আন্তঃসরকারি দায়।
এক দশকে দ্বিগুণের বেশি ঋণ
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ গত এক দশকে নজিরবিহীন গতিতে বেড়েছে। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশটির জাতীয় ঋণ ছিল প্রায় ১৯.৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে—অর্থাৎ এক দশকেরও কম সময়ে ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো প্রশাসন দায়ী নয়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ব্যাপক সরকারি ব্যয়, দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি, কর হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্রমবর্ধমান ব্যয়—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা দ্রুত বেড়েছে। ট্রাম্প ও জো বাইডেন—উভয় প্রশাসনের সময়ই ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সুদ পরিশোধেই বাড়ছে চাপ
ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়। রয়টার্স এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ এখন ফেডারেল বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয় এবং তা মেডিকেয়ারের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে; সামাজিক নিরাপত্তার পর এটি অন্যতম বৃহৎ ফেডারেল ব্যয়।
উচ্চ সুদের হার ও পুরোনো ঋণ নতুন সুদহারে পুনঃঅর্থায়ন করার কারণে ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ফলে শিক্ষা, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য সরকারি কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের হাতে তুলনামূলকভাবে কম সুযোগ থাকবে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
জুলাইয়ে বড় বাজেট ঘাটতি
জাতীয় ঋণের এই মাইলফলকের পেছনে সাম্প্রতিক বাজেট ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখছে। রয়টার্স এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু জুলাই মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ছিল প্রায় ৪৩২ বিলিয়ন ডলার—যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় মাসিক ঘাটতি। সামাজিক নিরাপত্তা ও মেডিকেয়ারের ব্যয় বৃদ্ধি এবং শুল্ক থেকে প্রত্যাশার তুলনায় কম রাজস্বসহ বিভিন্ন কারণে ঘাটতি বেড়েছে।
ট্রাম্পের নতুন নীতিতেও ঋণ বাড়ার আশঙ্কা
ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক ব্যয় ও করসংক্রান্ত উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। রয়টার্স এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বহুল আলোচিত “One Big Beautiful Bill Act”-এর কারণে আগামী বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণে আরও প্রায় ৪.৭ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজেট পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান ঋণ সরকারের ভবিষ্যৎ ব্যয় পরিচালনার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক মন্দার সময় সরকারি সহায়তা দেওয়া এবং নতুন সংকট মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে
জাতীয় ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সরকারি বন্ডের বাজারেও চাপ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার সাম্প্রতিক সময়ে বহু বছরের উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সরকারি ঋণ ধারণের জন্য বেশি রিটার্ন দাবি করছেন।
বুধবার পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের পুনঃক্রয় কার্যক্রম (buyback operation) বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিটি কার্যক্রমে আগের ২ বিলিয়ন ডলারের পরিবর্তে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পর দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন বন্ডের সুদের হার কিছুটা কমেছে এবং বৈশ্বিক বন্ড বাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে মার্কিন ঋণ ও বন্ডবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হারও বেড়েছে। Reuters জানিয়েছে, মার্কিন ট্রেজারির সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পর ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুদের হারও কিছুটা কমেছে। একই সময়ে ডলারের ওপর চাপ এবং সোনার দামে বড় উত্থান দেখা গেছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু একটি পরিসংখ্যানগত রেকর্ড নয়; এটি দেশটির দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি ও ঋণনির্ভর সরকারি ব্যয়ের গভীরতর সমস্যার প্রতিফলন। বাজেট পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলছেন, ঋণের এই গতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক নমনীয়তা আরও কমে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নতুন করে ঋণ নেওয়াও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এখন ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করলেও এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, সুদের হার, সরকারি ব্যয়, কর রাজস্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনগুলোর আর্থিক নীতির ওপর। তবে ঐতিহাসিক এই মাইলফলক ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের আর্থিক নীতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
শিক্ষা-গবেষণায় বাস্তবমুখী জ্ঞানচর্চার তাগিদ কুবি উপাচার্যের
কুবি প্রতিনিধি :কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা’ শীর্ষ...
হোমনায় উচ্ছেদের পর ফের সড়ক দখল ভোগান্তিতে পথচারীরা
মো. আবুল বাসার সরকার কুমিল্লার হোমনা পৌরসভার বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত দ...
প্যারোলে মুক্তি পেলেন ডা. দীপু মনি
স্বামীর মৃত্যুতে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ড...
ব্রাহ্মণপাড়ায় সালিশে নারীকে জুতাপেটা, ইউপি চেয়ারম্যান বললেন-...
মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি।।কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়ন...
হোমনায় ৭ বছরের শিশুর উলঙ্গ লাশ উদ্ধার
হোমনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:কুমিল্লার হোমনায় আয়েশা বেগম (৭) নামে এক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে এলাকায়...
২৩ মামলার আসামী মাদক সম্রাট কসাই রুবেল ফের গ্রেফতার
ফয়সল আহমেদ খান, বাঞ্ছারামপুর ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার শ...