প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: জাতীয় | প্রকাশ: 15 Aug 2026, 12:00 PM
শোকের ত্রিশে শ্রাবণ, শোকের পনেরোই আগস্ট
মোহাম্মদ রব
পনেরোই আগস্ট এলেই বাংলাদেশের আকাশ কেমন যেন ভারী হয়ে ওঠে। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির
বুকে গেঁথে থাকা গভীর ক্ষত। ১৯৭৫ সালের এই ভোরে যা ঘটেছিল, তা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না। এক রাতের
অন্ধকারে থেমে গিয়েছিল একটি স্বপ্নের নাম, একটি সংগ্রামের প্রতীক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যাঁকে এই জাতি
জাতির পিতা বলে ডাকে, তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল নিজের বাড়িতে, নিজের পরিবারের মাঝে। শুধু তিনি একা নন, তাঁর
সহধর্মিণী, তাঁর সন্তানেরা, এমনকি সেই শিশুটিও রেহাই পায়নি, যার হাতে তখনো খেলনার নরম স্পর্শ লেগে ছিল। এই
হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের পাতায় একটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে, মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে কৃতজ্ঞতা ভুলে গেলে।
আমার কাছে এই হত্যাকাণ্ডকে শুধু ক্ষমতার লোভে করা একটি সেনা অভ্যুত্থান বলে মনে হয় না। এর পেছনে ছিল আরও
গভীর, আরও সুপরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্র। যে আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার
এবং ধর্মনিরপেক্ষ সহাবস্থানের আদর্শ, সেই আদর্শের মূলে আঘাত হানাই ছিল এই চক্রান্তের আসল লক্ষ্য।
মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা পরাজিত হয়েছিলেন, যাঁদের চিন্তাচেতনা তখনো পাকিস্তানি মানসিকতায় বাঁধা ছিল, তাঁরা কখনোই এই
স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মকে হৃদয় থেকে মেনে নিতে পারেননি। পনেরোই আগস্ট তাই আমার চোখে শুধু একজন নেতার হত্যা
নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে সেই পরাজিত শক্তিকে আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে আসার
পথ তৈরি করা হয়েছিল। যে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে, তাকে ধীরে ধীরে একটি ভিন্ন
পথে, ধর্মীয় উগ্রতার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই প্রথম ধাপ ছিল এই হত্যাকাণ্ড।
১৯৭১ সালে যখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে জীবন বাজি
রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, যাঁরা সম্ভ্রম হারিয়েছেন, তাঁদের ত্যাগের
বিনিময়ে জন্ম নিয়েছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু সেই যুদ্ধে যাঁরা পরাজিত পক্ষের সঙ্গে ছিলেন, যাঁরা স্বাধীনতাকে
মেনে নিতে পারেননি, তাঁরা হারিয়ে যাননি। তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন সুযোগের। স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র কয়েক বছরের
মাথায়, যে হাত এই জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই হাতকেই থামিয়ে দেওয়া হলো চিরতরে। এবং তারপর যা ঘটেছিল, তা
কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন, ধীরে ধীরে তাঁদের পুনর্বাসিত করা হয়েছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ
পর্যায়ে। রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছিল, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সরাসরি
সাংঘর্ষিক।
এই ষড়যন্ত্রের ভয়াবহতা এখানেই যে, এটি শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়কেই
প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। যে বাংলাদেশ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকারের স্বপ্ন দেখেছিল,
তাকে ধীরে ধীরে একটি সংকীর্ণ, ধর্মীয় উগ্রতার দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রয়াস চলেছিল বছরের পর বছর। এই সত্যকে
বহুবার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রয়াস হয়েছে। তবু সত্য চাপা থাকে না। সময়ের সাথে সাথে
মানুষ আবার ফিরে তাকিয়েছে সেই ইতিহাসের দিকে, নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন করেছে, জানতে চেয়েছে, কেন এই হত্যাকাণ্ড
ঘটেছিল, কারা এর পেছনে ছিল, এবং কেন এত বছর পরও এর পূর্ণ সত্য উদঘাটন এত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পনেরোই আগস্ট আমাদের শুধু শোক প্রকাশের দিন নয়, এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। আমরা কি সেই আদর্শের প্রতি সৎ
থেকেছি, যার জন্য এত মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন? মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, সাম্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক মর্যাদা এবং
শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠেছিল, আমরা কি সেই পথে হাঁটছি, নাকি সেই পরাজিত শক্তির রেখে যাওয়া বীজ
আজও আমাদের সমাজে অঙ্কুরিত হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কিন্তু একটি বিষয়ে দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই,
যাঁরা এই দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশকে রক্ষা
করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
এই দিনে আমরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করি না, আমরা স্মরণ করি তাঁর পরিবারের সেই সদস্যদেরও, যাঁরা কোনো
রাজনীতির অংশ ছিলেন না, তবু নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন। একজন মা, একজন ভাই, একজন নববধূ, একটি শিশু, এই
মানুষগুলোর কোনো অপরাধ ছিল না। তাঁদের রক্তের দাগ ইতিহাসের বুক থেকে কখনো মুছে যাবে না। এই পরিবারকে
সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা প্রমাণ করে, এটি নিছক ক্ষমতার পালাবদল ছিল না, এটি ছিল একটি প্রতীককে
চিরতরে মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত প্রয়াস, যাতে সেই আদর্শ আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
আজকের বাংলাদেশ অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষার বিস্তার, নারীর ক্ষমতায়ন, এসব ক্ষেত্রে দেশ
এগিয়েছে অনেকটাই। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ যে সাম্প্রদায়িক উগ্রতার বীজ
পনেরোই আগস্টের পরে রোপিত হয়েছিল, তা সময়ে সময়ে নতুন রূপে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার
বানানোর প্রবণতা, সংখ্যালঘুদের প্রতি অসহিষ্ণুতা, নারীর অধিকারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান, এসবই সেই
পুরনো চক্রান্তেরই ধারাবাহিকতা। ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়া, এটাই একটি পরিণত জাতির
লক্ষণ। আমাদের বুঝতে হবে, পনেরোই আগস্টের ষড়যন্ত্র একদিনে শেষ হয়ে যায়নি, এর রেশ আজও নানা রূপে আমাদের
সমাজে বিদ্যমান।
আজ যখন নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন করে, ইতিহাসের সত্য জানতে চায়, তখন আমাদের দায়িত্ব হলো তাদের সামনে সেই সত্য
তুলে ধরা, নির্ভয়ে এবং সততার সঙ্গে। ইতিহাস কারো একার সম্পত্তি নয়, এটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। এই স্মৃতিকে
বিভাজনের হাতিয়ার না বানিয়ে বরং সচেতনতার আলো হিসেবে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত
চেতনা, অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন, তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা সেই পুরনো
ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতাকে চিনতে শিখব এবং তার বিরুদ্ধে সজাগ থাকব।
পনেরোই আগস্টের এই শোকের দিনে, আমরা মাথা নত করি সেই সমস্ত মানুষের স্মৃতির প্রতি, যাঁরা এই দেশের জন্মের
জন্য এবং পরবর্তীতে এর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের প্রতি এই শ্রদ্ধা কোনো
রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয় নয়, এটি একটি জাতির ইতিহাসের প্রতি সততার প্রশ্ন এবং সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে
প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞা, যা আজও আমাদের সমাজে নানা ছদ্মবেশে সক্রিয়। আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি, ইতিহাসকে
বিকৃত হতে দেব না, ভুলে যেতে দেব না। যে অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়ভিত্তিক স্বপ্ন নিয়ে এই দেশের জন্ম হয়েছিল, সেই
স্বপ্নের প্রতি বিশ্বস্ত থাকাই হবে এই শোকের দিনে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সকল শহীদ সদস্যকে। তাঁদের
আত্মা শান্তি পাক, এবং তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে ওঠার পথে আমরা যেন কখনো পিছপা না হই।
(লেখক অর্থনীতিবিদ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা–বিষয়ক স্বতন্ত্র পরামর্শক।)
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
কুমিল্লায় গ্যাস সংকটে থমকে আছে জীবন-জীবিকা
আয়েশা আক্তারগ্যাস নেই, তাই চুলা জ্বলছে না। গ্যাসের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে সিএন...
কুমিল্লায় কমেনি ডেঙ্গু-হামের প্রাদুর্ভাব, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাত...
কুমিল্লায় ডেঙ্গু ও হাম রোগের প্রাদুর্ভাব কমেনি। জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিনই ড...
হোমনায় নিখোঁজের ৫ দিন পর নদী থেকে মহিলার লাশ উদ্ধার
মো. আবুল বাসার সরকার কুমিল্লার হোমনায় নিখোঁজের পাঁচ...
শূন্যতেই ওয়েদেরল্ডকে ফেরালেন হাসান
নিজের প্রথম ওভারেই আঘাত হানলেন হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেট নেওয়া পেসারের বলে বোল্ড হয়ে গেলে...
নাঙ্গলকোটে ছাত্রদলের প্রতিবাদ মিছিলে হামলা, আহত-২০
নিজস্ব প্রতিবেদককুমিল্লার নাঙ্গলকোটে ছাত্রদলসহ অঙ্গ সংগঠনের প্রতিবাদ মিছিলে হামলাচালানোর অভিযোগ উঠেছ...
শত শত পাখির কলকাকলিতে সন্ধ্যা নামে দীর্ঘভূমিতে
মো. আনোয়ারুল ইসলামকুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি গ্রামে বিকেল নামলেই দেখা মেল...