মোঃ মাসুদ রানা , কুমিল্লা কলাম...
দেয়ালে দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম। পাড়া-মহল্লায় দলবদ্ধ কিশোরদের আনাগোনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, ভিডিও ও শক্তি প্রদর্শন। কোথাও মোটরসাইকেলের মহড়া, কোথাও মারামারি, আবার কোথাও ছিনতাই ও অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ।
একটি হত্যাকাণ্ডের পর হঠাৎ যেন দৃশ্যপটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা জেলা পুলিশের ১৮ থানায় শুরু হয়েছে কিশোর গ্যাংবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তিন দফায় ১ 6শ এর উপরেআটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে আগের দুই অভিযানে ৫৯৭ জনকে মুচলেকায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ২৮১ জনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তৃতীয় দফায় আটক ৪১৫ জনের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছিল।
সংখ্যাগুলোই বলে দিচ্ছে সমস্যার ব্যাপ্তি কতটা বড়। কিন্তু এত বড় অভিযানের পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে—
কিশোরদের যারা সংগঠিত করছে, তাদের নেটওয়ার্ক কোথায়?
১৮ থানায় অভিযান, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই
কুমিল্লা জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৮টি থানার বিভিন্ন ইউনিট ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে নিয়ে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। যেসব এলাকায় কিশোর গ্যাং বা বখাটেদের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব স্থানকে গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে।
প্রথম দফার অভিযানে ৬২৪ জন আটক হওয়ার পর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ৭৫, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ৪৬, বুড়িচংয়ে ৫০, মনোহরগঞ্জে ৪১, দাউদকান্দিতে ৫৯ এবং লাকসামে ৩৫ জন আটক হয়েছিল। বাকি থানাগুলোর বিস্তারিত সংখ্যা তখন যাচাই করা হচ্ছিল।
অর্থাৎ ১৮ থানায় অভিযান হলেও থানাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের পূর্ণাঙ্গ, প্রকাশ্য তালিকা এখনো সামনে আসেনি। এ অবস্থায় কোন এলাকায় কতটি গ্রুপ, কারা তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে, সদস্য সংখ্যা কত এবং কোন অপরাধে কারা জড়িত—এসব তথ্য জনসম্মুখে স্পষ্ট নয়।
দেয়ালে লেখা নাম—স্রেফ দেয়াললিখন, নাকি পরিচয়ের সংকেত?
কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেয়াল ও সীমানাপ্রাচীরে বিভিন্ন গ্যাংয়ের নাম ও সংকেত লেখার তথ্য উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অন্তত কয়েকটি গ্রুপের নামও উঠে এসেছে।
এসব নাম কিশোরদের মধ্যে গ্রুপ পরিচয় ও শক্তি প্রদর্শনের সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে।
দেয়ালে নাম লেখার পরও এসব গ্রুপের কার্যক্রম কেন আগে থেকে চিহ্নিত করা যায়নি?
আর যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য থাকে, তাহলে এসব গ্রুপের মূল সংগঠক বা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
‘আটক’ মানেই গ্যাং সদস্য নয়
এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানে আটক সবাইকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। অপরাধে সম্পৃক্ততা যাচাই করেই পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানও বলেছেন, অপরাধে সম্পৃক্ততা না থাকলে কাউকে হয়রানি করা হবে না।
ফলে ১,২৯৩ জন আটক—এই সংখ্যা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা নয়।
এটি অভিযানে আটক ব্যক্তির সংখ্যা। যাচাইয়ের পর কার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে, কে মুচলেকায় ছাড়া পেয়েছে—সেই বিভাজনটিই প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পরই কিশোর গ্যাং নিয়ে নতুন করে তীব্র আলোচনা শুরু হয়।
১৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়ার পর পরদিন লালমাই পাহাড়সংলগ্ন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোরও রয়েছে এবং কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
তদন্তে মোবাইল ফোন ও টাকা নিয়ে বিরোধের তথ্যও সামনে এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কোনো কারণ বা যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা।
অর্থাৎ একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি মামলার বিষয় নয়; এর সূত্র ধরে কুমিল্লার কিশোরদের অপরাধী নেটওয়ার্ক নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
টিকটক-রিলস থেকে গ্যাং নেটওয়ার্ক?
কুমিল্লার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কিশোরদের পরিচয় ও নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার বিষয়টি উঠে এসেছে। ছবি তোলা, ভিডিও তৈরি, টিকটক ও রিলসের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে দলগত যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
প্রশ্ন হচ্ছে—
একটি কিশোর কখন বন্ধু থেকে গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে উঠছে, সেই পরিবর্তনের জায়গাটি কি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শনাক্ত করতে পারছে?
দাউদকান্দির ঘটনাও সতর্কবার্তা
প্রথম দফার অভিযানে দাউদকান্দিতে ৫৯ কিশোর আটক হওয়ার পর অভিভাবক ও স্বজনদের একাংশ থানায় গিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার দাবি করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এই ঘটনা আরও একটি প্রশ্ন সামনে আনে—
অভিভাবকেরা কি সন্তানকে রক্ষা করতে গিয়ে তার অপরাধকেও অজান্তে প্রশ্রয় দিচ্ছেন?
অবশ্য কোনো কিশোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা এবং পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু অপরাধে জড়িতদের ক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি সামাজিক জবাবদিহিও জরুরি।
‘গ্যাং লিডার’ শনাক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
একদিকে শত শত কিশোর আটক হচ্ছে, অন্যদিকে অনুসন্ধানে বিভিন্ন গ্যাংয়ের নাম সামনে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এসব গ্রুপের সিদ্ধান্ত কে নেয়?
কে তাদের সংগঠিত করে?
কারা অস্ত্র বা মাদক সরবরাহ করে?
কারা তাদের অপরাধের পর আশ্রয় দেয়?
কারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ড প্রচার করে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
কিশোরদের ব্যবহার করে যদি কোনো বড় অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকে, সেই চক্রের মূল ব্যক্তিরা কি আইনের আওতায় আসছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু কিশোর ধরে এনে মুচলেকায় ছেড়ে দিলে সমস্যার মূল জায়গাটি অক্ষত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরাধে সম্পৃক্ততা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এটি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধানের জন্য পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে যুক্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাবাজারের অনুসন্ধানী প্রশ্ন
কুমিল্লায় এখন মূল প্রশ্ন শুধু “কতজন কিশোর আটক হলো?” নয়।
প্রশ্ন হলো—
কতজন অপরাধী হিসেবে শনাক্ত হলো?
কতটি সক্রিয় গ্যাং শনাক্ত হয়েছে?
প্রতিটি গ্যাংয়ের নেতৃত্বে কারা?
অস্ত্র-মাদকের উৎস কোথায়?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নেটওয়ার্ক কীভাবে চলে?
কিশোরদের পেছনে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী চক্র আছে কি না?
এবং এতদিন ধরে এসব গ্রুপ সক্রিয় থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এত সময় লাগল কেন?
কুমিল্লার ১৮ থানায় সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। তিন দফায় ১,২৯৩ জন আটক হয়েছে। কিন্তু এই বিশাল অভিযানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু আটকের সংখ্যায় নয়—কিশোরদের অপরাধে ঠেলে দেওয়া মূল নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস, অস্ত্র-মাদকের যোগসূত্র এবং প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষকদের কতটা শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা যায়, তার ওপর।
কুমিল্লার দেয়ালে লেখা গ্যাংয়ের নামগুলো তাই এখন শুধু দেয়ালের লেখা নয়—এগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সমাজের সামনে ঝুলে থাকা একের পর এক প্রশ্ন।