প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 28 Oct 2026, 10:14 AM
কুমিল্লা শহরের ঠাকুরপাড়ায় নিষ্কন্টক জায়গা কিনেও দখলে যেতে পারছেন না ক্রেতারা
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ৭ নং ওয়ার্ডের মদিনা মসজিদ সড়ক পেরিয়ে হিন্দুপাড়ায় ওই জায়গা। জায়গার বিক্রেতা , ক্রেতা ও দখলদার সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী।এ অবস্থায় দ্রুত অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন।
এদিকে জায়গা বুঝে নিতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় ও জেলা কমিটির কাছে আবেদন করেছেন ক্রেতারা। জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কান্দিরপাড় মৌজার সি এস ২২১,আর এস ১৮৩১ ও বি এস ৪০৮৩ দাগে ৫ দশমিক ৫০ শতক জমি কেনেন কালীতলা এলাকার প্রানেশ কর চৌধুরী, সঞ্জয় কুমার দে ও বিন্দিয়া ভট্টাচার্য্য। একই এলাকার প্রয়াত সাধন ঘোষ দস্তিদারের ছেলে রাহুল ঘোষ দস্তিদারের কাছ থেকে ওই জমি কেনেন। এরপর তাঁরা ওই জায়গার খতিয়ান করেন। তাঁরা জমির খাজনা দেন। একই সঙ্গে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন থেকে হোল্ডিং নম্বরও পেয়ে সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দেন। কিন্তু ওই জায়গার কিছু অংশে ছোট আকারের স্থাপনা করে অবস্থান করছেন সাধন ঘোষ দস্তিদারের জেঠাতো বোন সমিতা দাস, সমিতা দাসের ছেলে উদয় দাস ও মেয়ে মুনমুন দাস। সমিতা দাসের বিয়ে হলেও তিনি এখানে কাকাতো ভাই সাধন ঘোষ দস্তিদারের কাছ থেকে বাড়ি নিয়ে থাকেন। ছেলে উদয় দাস বিয়ে করেননি। মেয়ে মুনমুন দাসের বিয়ে হলেও তিনিও মায়ের কাছে থাকেন। কিন্তু জমি বিক্রি হওয়ার পরও সেখানে অবস্থান করছেন সমিতা দাস, উদয় দাস ও মুনমুন দাস। তাঁরা কোনভাবেই ওই জাযগা ছাড়তে চান না। কিন্তু এই জমির কোন মালিকানা তাঁদের নেই। সমিতা দাস নিজেই স্বীকার করেছেন এই জায়গার মালিক তিনি নন। তিনি এখান থেকে এক গন্ডা জায়গা চান। আর তাঁর ছেলে উদয় দাস ও মেয়ে মুনমুন দাস বলেছেন, তাঁরা আদালতের মাধ্যমে এই জায়গা ছাড়তে চান।
তবে জায়গার বর্তমান মালিকেরা বলেছেন, টাকা দিয়ে নিষ্কন্টক বৈধ জায়গা কিনেছি। আমাদের কেনা জায়গায় আমরা যাব। আমরা বলেছি, যাঁরা কিছু অংশে স্থাপনা করে আছেন তাঁদের সময় দেব। তাঁরা মালামাল গুছিয়ে জায়গা ছেড়ে দিতে। কিন্তু গত এক বছরেও আমরা তাঁদের উচ্ছেদ করতে পারিনি।
জানতে চাইলে সমিতা দাসের ছেলে উদয় দাস বলেন, ‘ আমি যদি অবৈধ দখলদার হতাম, তাহলে তো ওই জায়গায় ভবন করতাম না। আমি যখন এখানে থাকার জন্য স্থাপনা করি তখন রাহুল ঘোষ দস্তিদার ও তাঁর বোন সুস্মিতা ঘোষ দস্তিদার এসেছিলেন। তাঁরা আমাকে বড় করে ঘর তুলতে বলেছিলেন।
আপনার কাছে এই জায়গার কোন দলিল আছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘ এখন আমার কাছে দলিল নাই। আমার এক রিলেটিভ বলেছেন আগামী বছরের মার্চ এপ্রিলে জমির দলিল সংগ্রহ করে দেবেন। জমির ক্রেতারা আমাদের উচ্ছেদের জন্য চাপ দিচ্ছে।’
কিন্তু আপনি তো জমির ক্রেতাদের একজনকে সন্ত্রাসী বলেছেন, রাহুলদের না জানিয়ে ঘর তুলেছিলেন। তখন রাহুল চট্রগ্রাম থেকে কুমিল্লায় এসে বাধা দেন। আপনারা তাঁদের তাড়িয়ে দেন।
এ প্রসঙ্গে উদয় দাস বলেন,‘ আমাকে হুমকি ধমকি দিচ্ছে। তাই আমি সন্ত্রাসী বলেছি। ’
উদয় দাসের মা সমিতা দাস বলেন,‘ আমি এই জায়গার মালিক না। আমার কাছে কোন দলিল নাই। যেহেতু আমরা এখানে টাকা খরচ করে ঘর তুলেছি, তাই এক গন্ডা জমি চাই। আমি রাহুলের বাবার জেঠাতো বোন। প্রথমে আমরা এ বাড়িতে ভাড়ায় উঠি। এরপর স্থাপনা করি।
উদয় দাসের বোন মুনমুন দাস বলেন,‘ আমাদের কাছে দলিল আছে। আমরা কোর্টে এটা পায়সালা করতে চাই।’
কালীতলা কালীমন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও লালমাই উপজেলার দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিতাই চান সরকার বলেন,‘ উদয় দাসেরা এখানে দীর্ঘদিন ভাড়াটিয়া ও আত্নীয় হিসেবে আছে। এখন এই জমি আমাদের একই পাড়ায় তিন ব্যক্তি কিনেছেন। তাঁদের কেনা সঠিক।’
কালীতলা কালীমন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি এডভোকেট অশোক মজুমদার বলেন,‘ এই জায়গা প্রানেশ্বর কর চৌধুরী, সঞ্জয় কুমার দে ও বিন্দিয়া ভট্টাচার্য্য কিনেছেন।
জমির অন্যতম ক্রেতা প্রাণেশ্বর কর চৌধুরী বলেন, আমরা টাকা দিয়ে জমি কিনেছি। নামজারি করেছি। হোল্ডিং নম্বরও দিয়েছি। অবৈধ দখলদাররা জমি ছাড়ছে না। তারা মানহানিকর কথা বলেছে। সংবাদ সম্মেলন করেছে। তাঁরা জায়গার মালিকও না। আমরা দ্রুত আমাদের জায়গায় যেতে চাই।’
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, কালীতলা মন্দির এলাকাটি মূলত হিন্দুপাড়া। এখানে বসবাসরতরা সবাই হিন্দু। এখানে জমি বিক্রি করতে হলে হিন্দুদের কাছে বিক্রি করার অলিখিত নিয়ম আছে। ভাড়াটিয়াও হিন্দু দেওয়া হয়। ১৯৫৭ সালের ২৬ আগস্ট ঠাকুরপাড়া কালীতলা এলাকার বাসিন্দা কামিনী কুমার চন্দ এই জায়গার মালিক হন। এরপর ১৯৭৩ সালের ২৩ জুলাই সাফ কাবলা দলিল মূলে ৫ দশমিক ৫ শতক জায়গার মালিক হন সাধন ঘোষ দস্তিদার। ১৯৯৭ সালে সাধন ঘোষ দস্তিদার তাঁর জেঠাতো বোন সমিতা দাসের জামাই মিলন কান্তি দাসকে ওই জায়গার উপর থাকা স্থাপনা ভাড়া দেন। সাধন ঘোষ দস্তিদার তখন চট্টগ্রামে থাকতেন। ২০০১ সালের ৩১ জুলাই সাধন ঘোষ দস্তিদার মারা যান। তখন তাঁর ছেলে রাহুল ঘোষ দস্তিদার নাবালক ছিলেন ( রাহুলের জন্ম ১৯৯৯ সালের ৯ ডিসেম্বর) । ২০১৫ সালে রাহুল ঘোষ দস্তিদার জানতে পারেন তাঁর জায়গায় স্থাপনা করছেন উদয় দাস। খবর পেয়ে রাহুল, তাঁর মা ও বোন বাড়িতে আসেন। তাঁরা স্থাপনা করতে বাধা দেন। তখন তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা কালীতলা এলাকার হিন্দু সমাজের নেতাদের বিষয়টি অবহিত করেন। কিন্তু কোন সুরাহা পাননি। এরই মধ্যে রাহুল ঘোষ দস্তিদার সাবালক হয়েছেন। তিনি আইনজীবী হয়েছেন। যেহেতু তিনি চট্রগ্রামে অবস্থান করছেন, তাই কুমিল্লার জায়গা বিক্রি করে দিয়েছেন।
জানতে চাইলে রাহুল ঘোষ দস্তিদার বলেন,‘ এই জমি ও বাড়ি আমার বাবার। আমি আমার বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান। বাবার মৃত্যুর পর জমির মালিক আমি। আমি আমার জমি বিক্রি করেছি। এখানে যাঁরা অবৈধভাবে দখল করে আছেন, তাঁরা আমার কোন অংশীদার নয়। অবৈধভাবে তাঁরা এখানে আছেন। প্রশাসন ও এলাকাবাসীকে বলব, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে এগিয়ে আসুন। আমি হিন্দুদের কাছেই জমি বিক্রি করেছি। যাঁরা জমি কিনেছেন তাঁরা এই পাড়ার মানুষ। যাঁরা অবৈধভাবে আছে, তাঁরা এই এলাকারও না। তাঁরা আমার বাবার ভাড়াটিয়া ছিলেন।’
এদিকে এই জমি দখলে নিতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে আবেদন করেছেন জায়গার ক্রেতা প্রাণেশ কর চৌধুরী , সঞ্জয় কুমার দে ও বিন্দিয়া ভট্টাচার্য্য। গত ৫ অক্টোবর কুমিল্লা জেলা কমিটির মাধ্যমে তাঁরা ‘অস্থায়ী স্বত্ববিহীন মাসিক ভাড়াটিয়া কর্তৃক প্রকৃত মালিক এর বরাবরে দখল হস্তান্তর না করে জোরপূর্বক বেআইনিভাবে দখল’ এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকশী সুপারিশ করেন। তিনি লেখেন,‘ যাঁরা এই সম্পত্তি ক্রয় করেছে তারা আমার পরিচিত অতি সজ্জন। তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারী যারা এই জমিতে আছে তারাই দখলকারী। ক্রেতারা যাতে দখল বুঝিয়া পায় সে ব্যাপারে ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার জোর সুপারিশ থাকবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকশী বলেন, ‘যাঁরা এখানে অবস্থান করতেছে, তাদের কিন্তু কোন ডকুমেন্টারি কোন বিষয় নাই। যাঁরা কিনেছে তারা সঠিক এবং তারা খারিজও করেছে। আমরা মনে করি, এখানে গ্রুপ অফ হিন্দু যারা কিনেছে তারা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে এটার মধ্যে যাওয়ার অধিকার রাখে এবং তাদের সাথে আমার জানামতে অনেকগুলো মিটিংও করেছে যে, সহজে যাতে তাঁরা উঠতে পারে। তাদেরকে এলাকার লোকজনকে দিয়ে ভালোভাবে বুঝিয়েছে। এখন একটি বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যাঁরা এখানে অবস্থান করছেন তাঁরাও সনাতনী। আপসে যাতে চলে যায়, এটাই আমরা প্রার্থনা করি। এটা একটা সনাতনী পাড়া। সমাজ ভালো রাখার জন্য যেন কোন রাজনীতি না হয়। সমাজ ভালো রাখার জন্য যেন আপসে তাঁরা চলে যায়।’
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
বুলেট বৈরাগী হত্যা
নিজস্ব প্রতিবেদক কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে...
কুমিল্লায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন, হাজারো নেত...
আয়েশা আক্তারবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লায় বর্ণাঢ্য র্যালি...
কুবি শিক্ষার্থী ফারজানার মরদেহ উদ্ধার, স্বামীসহ ৭ জনের বিরুদ...
কুবি প্রতিনিধিনারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ভাড়া বাসা থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগ...
কুমিল্লায় বিদেশি পিস্তল ও দুই ম্যাগাজিন উদ্ধার
আয়েশা আক্তারকুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল ও দুটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে...
লালমাইয়ে পানিতে ডুবে দুই ভাইয়ের মৃত্যু
কাজী ইয়াকুব আলী নিমেলকুমিল্লার লালমাইয়ে বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে পুকুরের পানিতে ডুবে একই পরিবারের দুই শ...
দীর্ঘ তিন দশকের পথচলার অবসান: পরপারে চলে গেলেন পত্রিকা বিক্র...
বেলাল উদ্দিন আহাম্মদ, মুরাদনগর কুমিল্লা প্রতিনিধিঃদীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভোরের আলো কাগজ হাতে...