...
শিরোনাম
কুমিল্লায় মহাসড়কে উল্টে যাওয়া বাসে মাইক্রোর ধাক্কা, ২ জন নিহত ⁜ তারেক রহমানকে কুমিল্লা সদর আসনটি উপহার দেবো - হাজী ইয়াছিন ⁜ কুমিল্লা-৪ আসনে চ্যালেঞ্জের মুখে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ⁜ ভারত যদি আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে দেখে সেটা হবে ভুল রিডিং - হাসনাত আবদুল্লাহ ⁜ লালমাইয়ে জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণ ⁜ চৌদ্দগ্রাম বাজারে মহাসড়কের পাশের অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদ ⁜ ভিক্টোরিয়া কলেজে শহীদ ওসমান হাদির গ্রাফিতিতে কালো রঙ নিক্ষেপের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ⁜ বুড়িচংয়ে উপজেলা বিএনপির “দেশ গড়ার পরিকল্পনা” শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত ⁜ ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দলা ইউনিয়নে শীত উপহার পেল ২’শ পরিবার ⁜ দুর্নীতিমুক্ত কুমিল্লা গড়তে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে জামায়াত প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদ ⁜ ব্রাহ্মণপাড়ায় মেম্বারকে জিম্মি করে তিন গাভী গরু লুট, পুলিশের অভিযানে উদ্ধার ⁜ হাইওয়ে পুলিশকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ডিআইজির নির্দেশ ⁜ তাফসীর মাহফিলে বিএনপি প্রার্থী জসিম উদ্দিনের প্রশংসা করলেন তারেক মনোয়ার ⁜ মুঃ রেজা হাসান কে সদর দক্ষিণ উপজেলায় ফুল দিয়ে বরণ ⁜ ব্রাহ্মণপাড়ায় কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ বিতরণ ⁜ বুড়িচংয়ে ৫৪তম শীতকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ ⁜ কুমিল্লায় ১৪টি অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ২২ লাখ টাকা জরিমানা ⁜ অপ্রতিম হাসিনা ওহাব ⁜ সাবেক মন্ত্রী কায়কোবাদকে জড়িয়ে আসিফ মাহমুদের মিথ্যাচারের প্রতিবাদে মুরাদনগরে ঝাড়ু মিছিল ⁜ দেবিদ্বারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ নেতা গ্রেফতার ⁜
Author Photo

প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 8 Jan 2026, 8:51 PM

...
অপ্রতিম হাসিনা ওহাব News Image

জুলফিকার নিউটন :

বিবর্তনের বহু যুগ ব্যাপী কর্মকাণ্ডে মানুষই একমাত্র প্রাণী যে শুধুমাত্র ইতিহাসের উপাদান নয়, ইতিহাসের নির্মাতাও বটে। অর্থাৎ অন্য প্রাণীর মতো সেও প্রকৃতির নিয়মাবলী মানতে বাধ্য ঠিকই, কিন্তু সেই নিয়মাবলীকে নিজের বিকাশের প্রয়োজনে নিয়োগ করবার সামর্থ্যও সে রাখে। সে যে তা পারে তার কারণ প্রাজাতিক ভাবেই সে এমন গুরুমস্তিষ্কের অধিকারী জীবজগতে তা তুলনাহীন। এই গুরুমস্তিষ্ক একদিকে তাকে দিয়েছে উদ্ভাবনার অমিত শক্তি, অন্যদিকে আত্মনির্মাণের অভূতপূর্ব সম্ভাবনা।

অবশ্য সম্ভাবনা এবং তার বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান বিস্তর। যেমন ভিতরের তেমনই বাইরের নানা প্রবল বাধা আজো অধিকাংশ মানুষের মনুষ্যত্বের বহুমুখী বিকাশকে ব্যাহত করেছে। ভয়, লোভ, ঈর্ষা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, মানসিক আলস্য ইত্যাদি বৃত্তি বা প্রবণতা মানুষের সহজাত অনুসন্ধিৎসা, প্রেম, সহযোগ, বিবেকিতা ও যুক্তিশীলতাকে শুধু দুর্বল করে না, অত্যাচার, সংঘর্ষ এবং সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অপর পক্ষে গত পাঁচ/ছ’ হাজার বছরে মানুষের রচিত বিবিধ সভ্যতার সম্প্রতিতম পর্বে পৌঁছেও আমরা এমন কোনো সমাজব্যবস্থা উদ্ভাবনা করতে পারিনি যেখানে শক্তিমান এবং বিত্তবান ঊনজনের প্রতিপত্তির নীচে অগণিত অধিজন বঞ্চিত জীবন যাপন করে না। বঞ্চিত অধিজনের বিক্ষোভ যাতে বিপ্লবের রূপ না নিতে পারে তার জন্য শক্তিমান ঊনজনের হাতে আছে প্রবল রাষ্ট্রশক্তি, সেনাপুলিশ এবং ধর্মীয় প্রতারণার নানা কৌশলী বিধিব্যবস্থা। সভ্যতার কেন্দ্রে এই যে সংকট-মনুষ্যত্বের প্রাজাতিক বিরাট সম্ভাবনা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষের মনুষ্যত্বহীন ধ্যানধারণা ও জীবনযাত্রা-একুশ শতকের সূচনাতেও তার কোনো অভিজ্ঞতাসিদ্ধ সমাধান এখনো পাওয়া যায় নি।

সংকটের দূরঅপনেয়তা সত্য, তবু ইতিহাস এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, সব যুগে এবং সব সমাজেই এমন কিছু স্ত্রী-পুরুষ দেখা যায় তাঁরা শুধু মনুষ্যত্বের অমিত সম্ভাবনা বিষয়ে সচেতন নন, নিজেদের জীবনে সেই সম্ভাবনার অনুশীলনে নিবেদিত প্রাণও বটে। নানা কারণের সমাবেশে কোনো কোনো যুগে কোনো কোনো সমাজে এই প্রকৃতির অনন্যতন্ত্র স্ত্রী-পুরুষ খুবই দুর্লভ, আবার কোনা কোনো সময়ে কোনো কোনো দেশে অনুকূল ঘটনারাজির সমাবেশে এই প্রকৃতির বেশ কিছু মানুষ একই সঙ্গে দেখা দেন। তখন সেখানে যা সূচিত হয় পশ্চিমে তাকে বলা হয় রেনেসাঁস, বাংলায় নবজাগরণ। এ ব্যাপারটি যুগে যুগে দেশে দেশে ঘুরে ফিরেই দেখা যায়।

মাতৃগর্ভে আমাদের চেহারা নানা রূপের ভিতর দিয়ে মনুষ্য রপ ধারণ করে। কিন্তু জন্মের পর থেকেই নানাভাবে চেষ্টা চলে শিশুকে সমাজ-স্বীকৃত একটি ধাঁচে গড়ে তোলবার। বিভিন্ন সমাজে, বিভিন্ন যুগে ধাঁচটির অদলবদল ঘটে, কিন্তু উদ্দেশ্যের অদলবদল ঘটে না। সেই উদ্দেশ্যটি হল সমষ্টিস্বীকৃত একটি ধাঁচের মধ্যে ফেলে ব্যক্তির স্বকীয় স্বাধীন বিকাশের সম্ভাবনাকে বিলুপ্ত করা। সমাজে যারা ক্ষমতার দখলদার ধর্ম, ঐতিহ্য, শাস্ত্র, লোকাচার ইত্যাদির নামে তারা এই ধাঁচে ফেলবার প্রক্রিয়াটি চালু করে। কিন্তু প্রতি শিশুর মধ্যেই নিহিত থাকে নিজস্ব একটি অস্মিতা অর্জনের সামর্থ্য। তবে সেই অর্জনের জন্য লাগে ইচ্ছাশক্তি ও প্রয়াস, যুক্তিশীলতা এবং সততা, একনিষ্ঠ সাধনা ও অনুশীলন। এখনো পর্যন্ত দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ সমজস্বীকৃত ছাঁচেই গড়ে ওঠে। কিন্তু কেউ কেউ তাঁদের প্রাজাতিক সামর্থ্যকে নিজের চেষ্টায় শত বাধাবিপত্তির সঙ্গে লড়াই করেই ক্রমে বাস্তবায়িত করেন-তাঁদের স্বোপার্জিত অস্মিতা তাঁদের জীবনযাত্রায়, চিন্তায়, ক্রিয়াকলাপে, ভাবনায় এবং রচনায় প্রকাশিত হয়। এই ভাবেই আমরা পাই সক্রেটিস থেকে বিদ্যাসাগর, মেরি ওয়লস্টোন ক্রাফ্ট থেকে বেগম রোকেয়া। কিন্তু কী ভাবে তাঁরা নিজেদের এই অনন্যতন্ত্র অস্মিতা গড়ে তুলেছিলেন তার বিবরণ ক্বচিৎ মেলে। এ ক্ষেত্রে ফরাসী নারীবাদী দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর মতো হাসিনা ওহাবকেও ব্যতিক্রম মনে করি। তার ৮৫ বছরের জীবনে কর্মকান্ডের ভিতর দিয়ে আমরা অনেকটা জানতে পারি কী ভাবে বহু বাধাবিপত্তি, আঘাত, অপমান ও ব্যর্থতার ভিতর দিয়ে মুসলমান মধ্যবিত্ত ঘরের একটি সাধারণ মেয়ে তাঁর আত্মশক্তি আবিষ্কার করেন, অপ্রতিম হাসিনা ওহাব হয়ে ওঠেন।

কিছু কিছু মানুষ আমাদের মধ্যে এসে থাকেন, যাঁরা আছেন বলেই আমাদের পরিপার্শ্বের যে শূন্যতা, আমাদের সামাজিক যাত্রায় যে লক্ষ্যহীনতা, আমাদের মানসিক জীবনে যে আকাল ও অনাবৃষ্টি, তার খানিকটা ক্ষতিপূরণ হয়। দৈনিক রুপসী বাংলার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের সহধর্মিনী হাসিনা ওহাব এই ধরনের মানুষ। বাংলাদেশের দিগন্ত জোড়া অনাবৃষ্টি ও অনাসৃষ্টির মধ্যে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এক সফল সুন্দর সমাজ স্বপ্নের অপরাজেয় প্রতীক। তিনি রোকেয়া-সুফিয়া কামালের দুরূহ সাধনার পথে এ যুগের অগ্রপথিক, যার মধ্যে মিলেছে সৃষ্টি ও কর্মের স্বতন্ত্র ধারা, ঘটেছে বিশ্বাসের ও আচরনের এক দুর্লভ সমন্বয়। 

হাসিনা ওহাব ১৯৪১ সালের ১ জুন অবিভক্ত ভারতবর্ষের মনিপুর রাজ্যের জোরহাট গ্রামে সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা আলী আজ্জম খান ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সেনাবাহিনীতে চাকুরীরত ছিলেন। মহাত্মাগান্ধীর আহ্বানে দেশপ্রেমের টানে বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি সেনাবাহিনীর চাকুরী ছেড়ে অবিভক্ত ভারতের রেলওয়ে কর্মচারি হিসেবে যোগদান করেন। হাসিনা ওহাবের শিক্ষা জীবন ফেনী গার্লস স্কুল, ১৯৬০ সালে মেট্রিকুলেশন, ১৯৬২ বিবাড়ীয়া সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইডেন মহিলা কলেজে বাংলায় সম্মান শ্রেণী এবং পরবর্তীতে ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। ১৯৬৫ সালে অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের সাথে পরিনয় সূত্রে আবন্ধ হন। চাকুরীজীবনে তিনি বাগিচাগাও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কুমিল্লা হাই স্কুল এবং সর্বশেষ লুৎফুন্নেছা স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

হাসিনা ওহাব তিন পুত্র ও তিন কন্যার জননী। পুত্র ও কন্যারা হলেন: আশিক অমিতাভ, আরিফ অরুনাভ, আসিফ তরুনাভ, শাহনাজ আফরোজ, নারগিস আফরোজ এবং নাদিরা আফরোজ। পিতার সংযমী ব্যক্তিত্ব মাতার দৃঢ় শাসন ও উন্নত রুচিবোধ, মাতামহের বিদ্যানুরাগ ও সৃষ্টিশীল সত্তা হাসিনা ওহাবের চরিত্র গঠনে পালন করেছে দুরসঞ্চারী ভূমিকা। জীবনচর্যায়  হাসিনা ওহাব আজীবন কল্যানপ্রিয় মৃত্তিকা পরায়ন, আত্মনিবেদিতা এক সংগ্রামী নারী। সমাজচিন্তা ও মানবমুক্তি তার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। 

তিনি ১৯৮০ সাল থেকে সমাজের অবহেলিত নারীদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে আত্মনিবেদিতা মহিলা সংস্থায় ২৫ বছরের বেশি সময় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হাসিনা ওহাব নিজের জীবনে যা দেখেছেন ভেবেছেন, শিখেছেন, যা তাকে স্বতন্ত্র করেছে, দীর্ঘ যুগের শিকড়গাড়া ধর্ম বিশ্বাস সমর্থিত পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থা সংস্কারে ও সাম্যের দাবিতে যা তাকে প্রবৃত্ত করেছে, সেই সব অভিজ্ঞতা এবং ভাবনা কে অগ্নিপ্রভ চেতনায় পৌছে দিয়েছেন আত্মনিবেদিতা মহিলা সংস্থার মাধ্যমে। যেহেতু তাঁর কাছে বেচে থাকার অবম শর্ত স্বাধীনতা, যেহেতু তাঁর বিশ্বাস অনুসারে স্বাধীনতার অনুভূতি মনুষ্যত্বের উৎস, যেহেতু তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা এবং বিচার বুদ্ধি থেকে এই নিশ্চিন্ত সিদ্ধান্তে পৌছেছেন যে, স্বাধীনতা না থাকলে জীবন অর্থহীন, সেহেতু নারীর মৌল অধিকার বিষয়ে তাঁর বাচনকলায় কোন দ্বিধা বা জড়তা বা অস্পষ্টতা নেই। তাঁর ভাষা ক্ষিপ্র, নির্মেদ, তড়িৎময়। 

১৯৮৮ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত তিনি কুমিল্লা পৌরসভার কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে তার স্বামী অধ্যাপক আবদুল ওহাব মৃত্যু বরণ করার পর হাসিনা ওহাব দৈনিক রূপসী বাংলা পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং অদ্যবধি পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মহিলা সম্পাদক হিসেবে উধরষু ঝঃধৎ কর্তৃক কীর্তিমতী এবং স্কয়ার গ্রুপ থেকে নারী সম্মাননা পদ অর্জন করেন। 

মুক্তবুদ্ধি, সাম্যবাদী দর্শন  এবং মানবতন্ত্রী প্রগতিশীল চিন্তা হাসিনা ওহাবের জীবনবোধের মৌল বৈশিষ্ট্য। মানুষের প্রতি প্রবল ভালোবাসা এবং জনমূল সম্পৃক্ততা হাসিনা ওহাবের জীবনদর্শেনের প্রধান ভিত্তি। মনুষ্যত্বের মুক্তিতে তার প্রবল বিশ্বাস। ধর্মীয় গোঁড়ামি তাঁকে কখনো স্পর্শ করেনি, কখনো তিনি নিজেকে আচ্ছন্ন করেননি সাম্প্রাদায়িক সংকীর্ণতায় । প্রবমান সময়ের পটভূমিতেই তিনি জীবনকে দেখেছেন, বিশ্বাস করেছেন যে বর্তমানের নেতি আর নাস্তি অতিক্রম করে মানুষ একদিন পৌঁছবেই প্রত্যাশিত মুক্তির অমরাবতীতে।

হাসিনা ওহাবের সাথে আমার পরিচয় ৪ দশক ব্যাপি। তাকে ঘিরে আছে চল্লিশ বছরের অজস্র স্মৃতি। নানা পরিবেশের নানা অঙ্গনের। আমাকে প্রথম দিকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষন করেছে তাঁর কর্মউদ্দীপনা, রুচিশীল, সংস্কারমুক্ত মন, শিল্প সাহিত্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগ, ধৈর্য্য এবং অবশ্যই তার সুন্দর, বুদ্ধিদিপ্ত মুখশ্রী ও বাকভঙ্গী, পরবর্তীকালে আমাকে মুগ্ধ করেছে তার অসামান্য ধৈর্য্য ও সহনশীলতা, দুঃসহ ব্যক্তিগত দুঃখ জয় করে সমষ্টির নিস্বার্থ কল্যান চিন্তা এবং সবশেষে সে কল্যানচিন্তা থেকে উৎসারিত তার সাংগঠনিক দক্ষতা, বিরল নেতৃত্বের গুনাবলী এবং অপূর্ব সাহসিকতা।

হাসিনা ওহাব খুবই ব্যপক অর্থে জীবনবাদী, জীবনপ্রেমী। সব বয়সের মানুষের সঙ্গে তিনি সহজে মিশতে পারেন, অনায়াসে তিনি তাদের শ্রদ্ধা, প্রীতি, স্নেহ ভালবাসা আদায় করে নেন। জীবনের শেষ পর্বে বিপুল প্রতিকুলতার ভিতরে তিনি যেভাবে প্রশান্ত স্নিগ্ধ মাধুর্য নিজেকে ঘিরে রেখেছেন তা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। শুধু নারী সমাজের জন্য নয়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে তিনি প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন। আজ সমাজ বহুক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেলেও এখনো কু সংস্কার ধর্মান্ধতা, বিলাস বিমুখতা, নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে ফেলার প্রবনতা খুব একটা হ্রাস পায় নি। অর্ধ শতাব্দীর আগে অবশ্য প্রতিক্রিয়াশীল এসব অশুভ শক্তি ছিলো আরো সক্রিয়। তা সত্ত্বেও হাসিনা ওহাব যে সহজ সাবলীলতার সঙ্গে সেসব অতিক্রম করে তার জীবনকে সার্থক ও উজ্জল করেছেন সে কথা সর্বদা শ্রদ্ধা ও প্রশংসার সঙ্গে স্বরণযোগ্য। 

মহৎ বেদনার পথ ধরে মহত্ত্বে উত্তীর্ণ হওয়ার ধারার সূচনা আমরা দেখতে পাই রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের কর্মময় জীবনে। এই বেদনা শুরুতে একান্ত ব্যক্তিগত, তারপর এ বেদনা ক্রমশ ব্যাপ্তি পেতে থেকে, ক্রমশ উর্ধ্বমুখী হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকে অতিক্রম করে নৈর্ব্যক্তিকতায়, বিশ্বজনীনতায় উত্তীর্ণ হয়। হাসিনা ওহাবের জীবনেও একই উধ্বর্তলের পুনরাভিনয় দেখা দিয়েছে। রোকেয়া নিজে আজীবন পর্দানশিন ছিলেন, হাসিনা ওহাব ও পর্দানশিন। যদিও এক আশ্চর্য- সুন্দর সপ্রতিভ চলাফেরার জীবন্ত উদাহরণ তিনি। হাসিনা ওহাবের সময়ে সমাজ নারীর অবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে। বৃহৎ সমাজে তাঁদের বিচরণ হয়েছে স্বচ্ছন্দে, কোনো জড়ত্বের চিহ্ন নেই। রোকেয়া থেকে হাসিনা ওহাবের ধারাবাহিকতা বা পারস্পর্য আছে কেবল একটি জায়গায়, সবাই মুক্ত মন নিয়ে যার যার বৃত্তে বিচরন করেছেন। এবং কিছুটা কাকতালীয়ভাবে, সবাই ব্যক্তিগত বেদনার অগ্নিস্পর্শে তাদের জীবনের নতুন মাত্রা খুজে পেয়েছেন। 

হাসিনা ওহাব শিক্ষার আলোকপ্রাপ্তা নারী। বিশ শতকের চতুর্থ দশকে শিক্ষানুরাগী উদারবাদী মুসলিম পরিবারের জন্ম নেয়ার সুবাদে উচ্চশিক্ষার সোপন অতিক্রমের সুযোগের তিনি সদ্ব্যব্যবহার করেছিলেন অতীব কৃতিত্বের সঙ্গে। বাঙালি মুসলিম মহিলাদের মধ্যে শিক্ষাগ্রহনের ও শিক্ষা প্রসারে যাঁরা অগ্রগণ্য তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বহু দায়িত্ব নির্বাহ করেছেন সুচারুভাবে, জড়িত ছিলেন বিবিধ সামাজিক এবং সাংগঠনিক কর্মকান্ডে। এর পাশাপাশি দৈনিক রুপসী বাংলার প্রতিষ্ঠাতা, অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের জীবনসঙ্গী হিসেবে এবং আপন জনদের বিশাল পারিবারিক গন্ডিতেও তিনি বাইরের সঙ্গে ঘরের মিল রচনা করেছেন সার্থকভাবে। 

আলোকিত সাংবাদিক দম্পত্তি হিসেবে এঁদের দুজনের সিদ্ধান্ত হল যে কোনও সত্যই নিত্য নয়, মানুষের নিজের কোনও সত্য নেই, প্রতি অবস্থাতেই সম্ভাব্য বিকল্প থাকে, মানুষকে বাছতে হয়, কিন্তু বাছবার এমন কোনও সর্বকালীন, সর্বজনীন নির্ণায়ক অপ্রাপ্য যা দিয়ে স্থির করা যায় যে নির্বাচনটি সঙ্গত ও সিদ্ধ। অথচ সচেতনভারে হোক বা না হোক নির্বাচন আমাদের নিয়তই করতে হয়, নির্বাচনের ভিতর দিয়েই আমাদের আস্তিত্বিক স্বাধীনতা প্রকটিত হয় এবং আমরা নিজেদের নির্মান করি। অপর পক্ষে আমাদের প্রতিটি নির্বাচন (যা সঠিক কিনা জানবার বা প্রমাণ করার কোনও উপায়ই নেই) অন্য মানুষদের জীবনকে প্রভাবিত করে। এ চেতনা আর্তির উৎস। এই আর্তি স্বাধীনতার মতোই মানুষী অবস্থার অনপনেয় শর্ত। 

তবে কি নৈতিকতা অর্থহীন? অধ্যাপক আব্দুল ওহাব- হাসিনা ওহাব এই দম্পতি একদিকে যেমন বুঝিয়েছেন যে সকলের উপরে সাধারণ কোনও নৈতিক নির্ধায়ক অপ্রযোজ্য, অন্যদিকে তেমনি ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাঁরা সব চাইতে জোর দিয়েছেন সততার উপরে। নিজের কাছে নিজে সৎ হতে হবে- অনুভবে, চিন্তায়, বিশ্বাসে, বাক্যে, আচরনে ঐক্যের সাধনাই তাঁদের কাছে ব্যক্তিজীবনের নৈতিক আদর্শ। কেন সততা মূল্যবান অথবা তার মূল্য কেন স্বতঃসিদ্ধ তার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা তাদের দর্শনে না মিললেও ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা কোন আদর্শের সংরক্ষনে ও সম্প্রসারনে অনন্যচিত্ত সে সম্পর্কে তাঁদের লেখায় এবং জীবনে কোনও অস্পষ্টতা নেই। তাঁরা ব্যক্তি স্বাধীনতা, ন্যায় এবং সাম্যের পক্ষে। যে সব প্রতিষ্ঠান, সম্পর্ক, নীতিনিয়ম, আচার আচরন স্বাধীনতাকে সঙ্কুচিত করে, যা অত্যাচার শোষনের সহায়ক, যা বেশির ভাগ স্ত্রী, পুরুষকে বঞ্চিত করে অল্প কিছু মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, তাঁরা দুজনেই তার বিরুদ্ধে। আর্তি এবং পারক্যবোধ থেকে অধ্যাপক আব্দুল ওহাব নিক্রিয় ঔদাসীন্যে আশ্রয় খোঁজেননি; চেষ্টা করেছেন বিরোধী সংগ্রামের ভিতর দিয়ে বঞ্চিত জনতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে। তাঁদের চিন্তায় এবং আচরনে অনতিক্রম্য আর্তি, পারক্যবোধ এবং বৈপ্লবিক প্রত্যয়ের সমাপাত স্বাধীনতাত্তোর বাঙালিদের মনে ব্যাপক ভাবে সাড়া তোলে। 

হাসিনা ওহাব বলেছেন- স্বাধীনতা তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মেয়েরা জীবনে স্বাধীনতাকে সব চাইতে বেশি মূল্য দিতে শিখুক, এটিই ছিল তাঁর কাম্য। সমাজে ও পরিবারে মেয়েদের ভূমিকা, নারী-পুরুষের মধ্যে নির্দিষ্ট সম্পর্ক, মেয়েদের ‘নারীত্ব’ (সেবা, মাতৃত্ব, লাবণ্য ইত্যাদি) এবং ছেলেদের ‘পৌরুষ’ (কর্তৃত্বপরায়ণতা, বলশালিতা ইত্যাদি)- এসব সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থ, নীতিগ্রন্থ, নীতিশাস্ত্র, লোকাচার এবং আইনকানুনের মাধ্যমে যে সব ধারণা এবং আচরণ পরম্পরাক্রমে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত সেগুলি যে প্রকৃতপক্ষে একেবারেই মনুষ্যত্ববিরোধী, বিচার বিশ্লেষণ করে, স্ত্রী-পুরুষের শুভবুদ্ধির কাছে আবেদন জানিয়ে তা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন। পুরুষশাসিত সমাজ-সংস্কৃতি নারীকে নির্বোধ, প্রশ্নবিমুখ পরনির্ভর, দুর্বল, আত্মমর্যাদাবোধহীন করে রেখে শুধু মেয়েদের নয়, সমগ্রভাবে মনুষ্যসমাজের অশেষ ক্ষতি করেছে- এ সম্পর্কে তাঁর মনে সংশয় নেই। শুধুমাত্র বিবাহ নয় স্ত্রী-পুরুষে সমান সমান হিসেবে বন্ধুতা; প্রতিদানহীন সেবার ভিতর দিয়ে আত্মবিলোপ নয়, স্বমর্যাদার চেতনায় অনুশীলনের ভিতর দিয়ে আত্মবিকাশ এবং পরিবারে প্রকৃত আত্মপ্রতিষ্ঠা; আর্থিক স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা- হাসিনা ওহাব আমাদেরকে এই সাধনায় আকৃষ্ট করতে চেয়েছেন । যুক্তিশৃঙ্খলা, সুবেদিতা, এবং বিবেকিতা, তাঁর প্রাজ্ঞ, প্রাতিস্বিকতায় মিলিত হয়েছে। শিক্ষকতায়, সমাজ সেবায় যে মানুষটির পরিচয় প্রকীর্ণ তিনি মনস্বীনি ও সংসারাভিজ্ঞ, প্রমিতাক্ষর এবং অপূর্ব নির্মানসম্পন্ন, নিয়মানুবর্তি এবং বিচারনিষ্ঠ, বিদগ্ধ এবং কল্যানচিকীর্ষু।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দুটি ব্যাপার ক্রমেই পরিষ্ফুট হয়ে উঠেছে। একটি তথ্যগত অন্যটি আদর্শগত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রবল ধাক্কায় অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে বাইরের বেশ কিছু বাধা অপসৃত হয়। পরীক্ষার অভাবে যেসব ধারণাকে স্বতঃপ্রমাণ বলে ধরা হত, বাস্তবে প্রমাণ দেবার সুযোগ ঘটায় তাদের ভিতরে অনেকগুলিই মূঢ়বুদ্ধির পরিচায়ক বলে ধরা পড়ে। অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই প্রমাণিত হয় জীবনের এমন কোনও ক্ষেত্রই নেই যেখানে নারীর সামর্থ্য এবং কৃতি-সম্ভাবনা পুরুষের তুলনায় কম। নারী উঠেছেন মাউন্ট এভারেস্টের চুড়ায়, গবেষণা করতে গিয়েছেন দক্ষিণ মেরুতে; অনেকগুলি দেশে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন নারী; পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার, স্মরণীয় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন কাব্য এবং উপন্যাস রচনায়, দর্শন-বিজ্ঞান-সমাজতন্ত্র চর্চায়, সমাজ সেবায় এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে। তথ্যের হিসাবে আজ কোনও সংশয়ের অবকাশ নেই যে, সমান সুযোগ-সুবিধা ব্যবস্থা থাকলে মেয়েরা কোনও ক্ষেত্রেই পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে থাকবে না। হাসিনা ওহাবের ছাত্রাবস্থায় কলেজে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতকোত্তর বিভাগগুলিতে ছাত্রীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত অল্প। এই দরিদ্র এবং রক্ষণশীল দেশে এখন অনেকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলিতেই সর্বোচ্চ স্থান লাভ করেননি, বিভিন্ন পেশায় এবং দায়িত্বশীল পদেও বিশেষ যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিচারপতি, জজ, অ্যাডভোকেট, গভর্নর, মন্ত্রী, অ্যামব্যাসাডর, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, সম্পাদক, জার্নালিষ্ট, শিল্পী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী বা ব্যাঙ্কার-এমন কোনও পেশা বা পদের কথা আজ ভাবা শক্ত যেখানে নারী নৈপুণ্য বা প্রকর্ষের পরিচয় দেন নি। 

এটি গেল তথ্যের দিক। আদর্শের দিক থেকে একথাও দ্রুত ষ্পষ্টতর হয়ে উঠছে যে আধুনিক সভ্যতার বিশ্বব্যাপী সমকালীন সংকট অতিক্রমের অন্যতম প্রধান শর্ত সমাজ-জীবনে নারীকে পুরুষের সমান মূল্যদান। আধুনিক সভ্যতা মানুষের আগ্রাসী বৃত্তিকে এবং পারক্যবোধকে প্রবল করে তুলেছে। ফলে শুধু যুদ্ধবিগ্রহ দাঙ্গা হাঙ্গামাই বাড়েনি, প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্গে যে ভারসাম্য জীবনের অপরিহার্য শর্ততাও দ্রুত ভেঙে পড়ছে। সাম্রাজ্য বিস্তার, যুদ্ধবিগ্রহ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ধর্ষকাম এসবের ভিতরে আগ্রাসী বৃত্তির নগ্ন নাটকীয় রূপ দেখতে পাই। কিন্তু আরও গভীরে দৃষ্টি দিলে বোঝা যায় আগ্রাসী বৃত্তি অপর স্ত্রী-পুরুষকে, পশুপক্ষী, তরুলতা, বিশ্বপ্রকৃতিকে শুধুমাত্র নিজের ভোগের উপাদান এবং উপায় মাত্র বলে বিবেচনা করে। পুরুষশাসিত সভ্যতা মানুষের আগ্রাহী প্রতিন্যাসকে সাফল্যের জন্য অপরিহার্য ভেবে তাকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে; আধুনিক শিল্পবিপ্লবোত্তর সভ্যতায় এই ঝোঁক প্রবলতর হয়ে উঠেছে। প্রকৃতি এবং অপর স্ত্রী-পুরুষকে উপায় মাত্র ভাবার ফলে একদিকে অপ্রেমের রাজত্ব বি¯তৃত হয়েছে, সমাজ এবং প্রকৃতি থেকে বিযুক্ত মানুষ পর্যবসিত হয়েছে ‘নিঃসঙ্গ দলবদ্ধতা’য়। অন্যদিকে হৃদয়হীন, দায়িত্বহীন ভোগ এবং অপচয়ের প্রাবল্যে প্রকৃতির সম্পদ দ্রুত নিঃশোষিত হচ্ছে, পরিবেশ হয়ে উঠছে প্রাণের পরিপন্থী। এই বিশ্বব্যাপী সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য অবিলম্বে প্রয়োজন উপযোগী সমাজ-আদর্শ, সমাজ-সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রিক-আর্থিক ব্যবস্থার ব্যাপক এবং গভীর রূপান্তর। এই উপযোগী আদর্শ ও ব্যবস্থার কেন্দ্রে আছে নারী ও পুরুষের বিশেষ ভূমিকা ও মূল্যের সম্যক স্বীকৃতি। 

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নারীরা হাতেকলমে প্রমাণ দিয়েছেন যে পুরুষদের তুলনায় তাঁদের কিছুই অসাধ্য নয়। এই সত্যের স্বীকৃতি এবং প্রতিষ্ঠা সমকালীন সমাজ-বিপ্লবের প্রথম করণীয়। সঙ্গে সঙ্গে এটিও হৃদয়ঙ্গম করা দরকার যে নারীদের এমন কিছু বিশেষ সামর্থ্য আছে যা পুরুষদের নেই এবং সেই সামর্থ্যের ফলে এমন কতগুলি গুণ বা বৃত্তি সাধারণত নারীদের ভিতরে দেখা যায়, বর্তমান সংকটের সমাধানের জন্য যেগুলির অনুশীলন স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের পক্ষেই সবিশেষ মূল্যবান। নারীরা গর্ভধারণ করেন, প্রায় দশ মাস শিশুকে নিজের দেহের ভিতরে রক্ষণ ও প্রবর্ধন করেন, তারপরও বেশ কিছুকাল তাদের লালন-পালনের দায়-দায়িত্ব বহন করেন। এ কারণে তাঁদের ভিতরে মমতা, সহনশীলতা, নিজের চাইতে অন্যের প্রয়োজনকে অধিকতর মূল্য দেবার প্রবণতা, সহানুভূতি এবং সেবা-শুশ্রূষার বৃত্তি পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি দৃঢ়মূল। বস্তুত পুরুষরা মেয়েদের এই গুণগুলির সুযোগ নিয়ে তাঁদের জীবনকে অন্তঃ পুরের মধ্যে আবদ্ধ রেখে এসেছে। তার ফলে মেয়েদের বিকাশ ব্যাহত, পুরুষদের চরিত্রের আভিমুখ্য একপেশে, বিকৃত, এবং সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসে ধর্মকাম প্রাবল্য পেয়েছে। আদর্শ হিসেবে যা প্রয়োজন তা হলো সমাজ-সংস্কৃতিতে এবং নাগরিক জীবন মেয়েদের সমান ভূমিকা দিয়ে এই গুণগুলির অনুশীলনকে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বসাধারণের জীবনচর্যার অন্তর্ভুক্ত করা। ম্যাচিসেমো (সধপযরংসড়) বা মর্দানি মনুষ্যত্বের বিকাশকে বিপথগামী করে, অন্তঃপুর বা শুধুমাত্র আপন পরিবার ও স্বজনের মধ্যে আবদ্ধ থাকলে চিত্তের প্রসার এবং প্রবর্ধন ঘটে না। মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ স্ফুটনের জন্যই দরকার সমাজ-সংস্কৃতির সমস্ত ক্ষেত্রে নারীদের অবাধ অংশগ্রহণের ব্যবস্থা। অপরপক্ষে সেই একই উদ্দেশ্যে পুরুষরা যদি আপন আপন চরিত্রে এবং ব্যবহারে নারীদের বিশেষ গুণগুলির চর্চা এবং পারিবারিক জীবনে নারীদের সঙ্গে সমান দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাতে তাঁদের ব্যক্তিত্ব সমৃদ্ধতর হবে। এবং উভয়ের জীবনের ধারায় এই পরিবর্তন ঘটলে মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে, মানুষ এবং মানুষের মধ্যে সংঘাত কমে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। 

সমাজের জমাট অন্ধকারের মধ্যে অর্ধ শতাব্দীর অধিক কাল ধরে প্রত্যয়, প্রগতি ও সাহসিকতার দীপশিখা নিয়ে পথ চলেছেন হাসিনা ওহাব।  মাতৃস্বরূপা তিনি, তিনি প্রেমময়ী, কল্যানী, অভয়দাত্রী, তিনি চিরকাল আমাদের মধ্যে থাকবেন। যেমন সুসন্নদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন তাঁর চিন্তা, নির্মেদ ও যথাযথ তাঁর ভাষা, তেমনি সত্যসন্ধ ও অনপেক্ষ তাঁর মনীষা। আমাদের অশেষ সৌভাগ্য যে, আমাদের জীবনকালে সমাজে ও রাষ্ট্রে এই ধরনের কয়েকজন খাঁটি এবং বড় মাপের মানুষ আছেন যাঁদের উপস্থিতি আমাদের মতো কনিষ্ঠজনদের চেতনাকে উর্ধ্বমুখী হওয়ার নিরন্ত প্রেরনা যোগায়। 




ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা
ট্যাগ: বৃহত্তর কুমিল্লা জাতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতি

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

লিংক কপি হয়েছে!

অন্যান্য খবর

কুমিল্লায় মহাসড়কে উল্টে যাওয়া বাসে মাইক্রোর ধাক্কা, ২ জন নিহত
কুমিল্লায় মহাসড়কে উল্টে যাওয়া বাসে মাইক্রোর ধাক্কা, ২ জন নিহ...

কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জের তুরনিপাড়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস মহাসড়কে উল্টে যাওয়ার পর মাইক্রোবাসের সঙ্গ...

তারেক রহমানকে কুমিল্লা সদর আসনটি উপহার দেবো - হাজী ইয়াছিন
তারেক রহমানকে কুমিল্লা সদর আসনটি উপহার দেবো - হাজী ইয়াছিন

নিজস্ব প্রতিবেদকগণতন্ত্র পুণ:রুদ্ধারের অবিসংবাদিত নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর ব...

কুমিল্লা-৪ আসনে  চ্যালেঞ্জের মুখে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী
কুমিল্লা-৪ আসনে চ্যালেঞ্জের মুখে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী

মোঃ আক্তার হোসেনকুমিল্লা-৪ আসনে নির্বাচনে অংশগ্রহন নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থী চার...

ভারত যদি আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে   দেখে সেটা হবে ভুল রিডিং - হাসনাত আবদুল্লাহ
ভারত যদি আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে দেখে সেটা হবে ভু...

নিজস্ব প্রতিবেদক, দেবিদ্বার কুমিল্লা-৪ আসনের জামায়াত জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির...

লালমাইয়ে জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি   শিক্ষা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণ
লালমাইয়ে জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া প্র...

নিজস্ব প্রতিবেদকলালমাই উপজেলায় ৫৪তম শীতকালীন জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া প্রতিযোগি...

চৌদ্দগ্রাম বাজারে মহাসড়কের পাশের   অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদ
চৌদ্দগ্রাম বাজারে মহাসড়কের পাশের অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উ...

এমরান হোসেন বাপ্পিকুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মহাসড়কের পাশের অবৈধ স্থাপনা ও ফুটপাত দখল করে বসা অবৈধ দোকানপ...

আজকের তারিখ
ইংরেজি তারিখ বাংলা সন
প্রিন্ট নিউজ
...
ছবির গ্যালারি
আমাদের Facebook Page
সর্বশেষ
➤ কুমিল্লায় মহাসড়কে উল্টে যাওয়া বাসে মাইক্রোর ধাক্কা, ২ জন নিহত
➤ তারেক রহমানকে কুমিল্লা সদর আসনটি উপহার দেবো - হাজী ইয়াছিন
➤ কুমিল্লা-৪ আসনে চ্যালেঞ্জের মুখে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী
➤ ভারত যদি আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে দেখে সেটা হবে ভুল রিডিং - হাসনাত আবদুল্লাহ
➤ লালমাইয়ে জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণ
➤ চৌদ্দগ্রাম বাজারে মহাসড়কের পাশের অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদ
➤ ভিক্টোরিয়া কলেজে শহীদ ওসমান হাদির গ্রাফিতিতে কালো রঙ নিক্ষেপের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
➤ বুড়িচংয়ে উপজেলা বিএনপির “দেশ গড়ার পরিকল্পনা” শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত
➤ ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দলা ইউনিয়নে শীত উপহার পেল ২’শ পরিবার
➤ দুর্নীতিমুক্ত কুমিল্লা গড়তে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে জামায়াত প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদ
➤ ব্রাহ্মণপাড়ায় মেম্বারকে জিম্মি করে তিন গাভী গরু লুট, পুলিশের অভিযানে উদ্ধার
➤ হাইওয়ে পুলিশকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ডিআইজির নির্দেশ
➤ তাফসীর মাহফিলে বিএনপি প্রার্থী জসিম উদ্দিনের প্রশংসা করলেন তারেক মনোয়ার
➤ মুঃ রেজা হাসান কে সদর দক্ষিণ উপজেলায় ফুল দিয়ে বরণ
➤ ব্রাহ্মণপাড়ায় কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ বিতরণ
➤ বুড়িচংয়ে ৫৪তম শীতকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ
➤ কুমিল্লায় ১৪টি অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ২২ লাখ টাকা জরিমানা
➤ অপ্রতিম হাসিনা ওহাব
➤ সাবেক মন্ত্রী কায়কোবাদকে জড়িয়ে আসিফ মাহমুদের মিথ্যাচারের প্রতিবাদে মুরাদনগরে ঝাড়ু মিছিল
➤ দেবিদ্বারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ নেতা গ্রেফতার
গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্কসমূহ
Logo

সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর হাসিনা ওহাব কর্তৃক ন্যাশনাল অফসেট প্রেস, আবদুর রশিদ সড়ক, বাগিচাগাঁও, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। নির্বাহী সম্পাদক: আরিফ অরুণাভ, মোবাইল:০১৭১২-৭৬৭৮৬৬, প্রধান বার্তা সম্পাদক: আসিফ তরুণাভ, ০১৭১১-৩৩২৪৯৮, বার্তা বিভাগ: ০১৯৭১-৩৩২৪৯৮, ব্যবস্থাপক: ০১৭১১-৫৭০৬৯৪, ঢাকা অফিস : ০১৮১৯-৬০২০২৩, ফোন: +৮৮০২৩৩৪৪০৩৯০০।

অফিসের ঠিকানা

২৪৬ রূপসী বাংলা ভবন

আব্দুর রশিদ সড়ক

বাগিচাগাঁও

কুমিল্লা।

যোগাযোগ

নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭১১-৩৩২৪৯৮, বার্তা বিভাগ: ০১৯৭১-৩৩২৪৯৮, ব্যবস্থাপক: ০১৭১১-৫৭০৬৯৪, ঢাকা অফিস : ০১৮১৯-৬০২০২৩, ফোন: +৮৮০২৩৩৪৪০৩৯০০।

E-mail:rupashibangla42@gmail.com

website: www.dailyrupashibangla.com


আমাদের অনুসরন করুন :
© 2026 Daily Rupashi Bangla. All rights reserved.
Design & Developed by: alauddinsir