স্টাফ কোয়ার্টার।।
কুমিল্লা নগরীতে সাংবাদিক ও পেশাজীবী মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্রকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক হামলা, ভয়ভীতি, চাঁদাবাজি, মামলা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে। প্রায় এক যুগ ধরে এসব কর্মকাণ্ড চললেও একাধিক মামলা, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। এতে তিনি ও তাঁর পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র বাদী হয়ে তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে আসামি করে কুমিল্লা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-১-এ একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানাকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩০৭, ৩৮৫, ৪২০, ৫০০, ৫১১, ৩৭৯ ও ৫০৬(২)/৩৪ ধারায় করা হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। মামলা নম্বর ৬১৫/২৫।
শুভ্রর অভিযোগ, ২০১৭ সালের ৩ মে থেকে ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জীবনের নিরাপত্তা ও বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে তিনি একাধিক জিডি করেছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা, চাঁদা দাবি, প্রকাশ্যে মারধর এবং মোটরসাইকেলে আসা হেলমেটধারী দুর্বৃত্তদের দ্বারা পথরোধ করে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি তাঁর।
মামলা করেও থামেনি ভয়ভীতি ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় এরই মধ্যে দুজন আসামি গ্রেপ্তার হলেও অন্য সহযোগীরা মামলা প্রত্যাহারের জন্য নানাভাবে চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে বলে অভিযোগ করেছেন শুভ্র। তাঁর বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় আরও দুটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে বলেও তিনি জানান। এর মধ্যে একটি এফআইআর নম্বর ৪১, জিআর ৮৫০, তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২৪ এবং অন্যটি দস্যুতা সংক্রান্ত এফআইআর নম্বর ৫১, জিআর ৮১২, তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০২৫।
শুভ্রর অভিযোগ, চক্রটির সদস্যরা দিনের বেলায় মুখে মাস্ক ও মাথায় লাল-কালো হেলমেট পরে নাম্বার প্লেটবিহীন মোটরসাইকেলে চলাচল করে। মূল পরিকল্পনাকারীর নির্দেশে ভাড়াটে বখাটে, ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ব্যবহার করে পরিকল্পিত অপরাধ সংঘটনের অভিযোগও করেছেন তিনি।
এমনকি ব্ল্যাকমেইলিং, সাইবার হয়রানি, মিথ্যা পরিচয়ে মানুষকে ভয় দেখানো এবং অপহরণ-জিম্মির মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গেও চক্রটির সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অপপ্রচার
শুভ্র আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন অনিবন্ধিত ফেসবুক পেজ ও মেসেঞ্জার গ্রুপে তাঁর অশ্লীল ও বিকৃত ছবি ছড়িয়ে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি ভবিষ্যতে তাঁর লাশ কাফনে মোড়ানো থাকবে—এমন প্রতীকী ছবি ছড়িয়ে তাঁকে মানসিকভাবে আতঙ্কিত করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ২০১৯ সাল থেকে এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতনামা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা ও পুলিশি রেকর্ড রয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁর অভিযোগ, অভিযুক্তদের মূল কর্মকাণ্ডই অপরাধনির্ভর এবং অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পক্ষকে ব্যবহার করে মামলা, হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটানো হয়।
শুভ্রর আরও অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দিয়ে হয়রানি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করানোর চেষ্টা এবং পরিচিতজনদের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে মামলা প্রত্যাহার ও ভবিষ্যতে আরও ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
নিরাপত্তা চেয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে
আইনি সুরক্ষার জন্য গত ১৩ মার্চ ২০২৬ কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অনলাইন জিডি করেন শুভ্র। জিডি নম্বর ৯৫৩।
এছাড়া অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে ১০ মে ২০২৬ কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। এর রিসিভড ডকেট নম্বর ৭৫৮১। একই দাবিতে ২৬ মে ২০২৬ পুলিশ সুপারের কাছেও লিখিত স্মারকলিপি দেন তিনি, যার স্মারক সূত্র নম্বর ৩৮৬৭/m।
বিষয়টি অবগতির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, আইজিপি, র্যাবের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, জেলা পিপি, কুমিল্লা সেনা কমান্ড, ডিবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতি এবং কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছেও অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘গণমাধ্যমকর্মী নিরাপদ না হলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?’ মানবাধিকার কর্মী ও ‘মানবাধিকার খবর’-এর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, একজন গণমাধ্যমকর্মী আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও যদি বছরের পর বছর নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রশাসনের উচিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ভুক্তভোগী সাংবাদিকের দায়ের করা মামলা ও জিডির ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তারা ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করায় গ্রেপ্তারে কিছুটা সময় লাগছে। তবে দ্রুতই সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
একজন সাংবাদিকের ওপর ধারাবাহিক হামলা, ভয়ভীতি, চাঁদাবাজি ও সামাজিকভাবে হেয় করার অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়—এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন কোনো সাংবাদিক বা নাগরিককে একইভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।