প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: জাতীয় | প্রকাশ: 13 Oct 2026, 9:59 AM
দুই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করেছে রাতের কুমিল্লা কতটা অনিরাপদ
আয়েশা আক্তার
একটি বাস থেকে ভুল স্টপেজে নামা, গভীর রাতে বাড়ি ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠা—এতটুকুই কি কারও জীবনে ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ পরিণতি? কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কয়েকটি বিশ্বরোড এলাকায় সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের অভিযোগ সামনে আসার পর এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের মনে। রাতের অন্ধকারে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা কোথায়? যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এসব মোড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশ দিয়ে যাওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে পদুয়ার বাজার, বেলতলী, কোটবাড়ি, ঝাগুরঝুলি ও আলেখার চর বিশ্বরোড। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রামে যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পথে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসা যাত্রীদের অনেকে এসব স্থানে নামেন। অথচ অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে গভীর রাতে এসব এলাকায় নামা যাত্রীদের একটি অংশ ছিনতাই, অপহরণ ও যৌন হয়রানির ঝুঁকিতে পড়ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই পাঁচ মাসের ব্যবধানে দুইটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে এসেছে। নিহতদের একজন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫), অন্যজন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। দুই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও যাত্রাপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নির্ধারিত স্টপেজে নামতে না পেরে প্রাণ গেল কাস্টমস কর্মকর্তার; গত ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। বাসে ঘুমিয়ে পড়ায় নির্ধারিত স্টপেজে নামতে পারেননি। পরে ঝাগুরঝুলি বিশ্বরোডে নামার পর মধ্যরাতে ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েন বলে জানা যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, চালক ও যাত্রীবেশে থাকা দুর্বৃত্তরা তাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে মারধর ও অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরে চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে তাঁর মৃত্যু হয়।
একজন কর্মজীবী মানুষ রাতের যাত্রায় গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন—এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যাত্রীবেশে অপরাধী, নাকি চালকের ছদ্মবেশে দুর্বৃত্ত—যদি এমন আশঙ্কা থেকেই থাকে, তাহলে রাতের যাত্রীরা কতটা নিরাপদ? বাড়ি ফেরার পথেই শেষ হলো স্কুলছাত্রীর জীবন; আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ড। কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী কক্সবাজার থেকে ফিরে বাড়ি যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেছিল। পরে লালমাই উপজেলার ভোরাজগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অটোরিকশাচালকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক পরিণতি জনমনে ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, যাত্রী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত যানবাহন ও চালকদের পরিচয় যাচাই, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি এবং রাতে যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম ও নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখা জরুরি।
মহাসড়কের চারটি অংশে অন্তত ২০টি ঘটনা; কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক প্রক্টর আবদুল হাকিমের বক্তব্য পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকটি সামনে এনেছে। তিনি জানান, দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে পদুয়ার বাজার, আলেখার চর, কোটবাড়ি ও ঝাগুরঝুলি বিশ্বরোড এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ছিনতাই, অপহরণ ও যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অন্তত ২০টি ঘটনা তাঁর নজরে এসেছে। এসব ঘটনায় কুমিল্লা সদর দক্ষিণ ও কোতোয়ালি মডেল থানায় একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—একাধিক অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে অপরাধের ঝুঁকি কেন কাটছে না? অভিযোগগুলোর তদন্ত ও নিষ্পত্তির অগ্রগতি কী? কোন এলাকাগুলোতে অপরাধ বেশি ঘটছে, তার ভিত্তিতে কি নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হচ্ছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে অভিযোগের নথি, মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি এবং পুলিশের অপরাধসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
দুই টহল দল দিয়ে কতটা সামলানো সম্ভব? ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল মুমিন জানিয়েছেন, মহাসড়কের পাঁচটি স্থানে রাতে যাত্রীরা নামেন এবং গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা সেই সুযোগ কাজে লাগায়। যাত্রীদের নিরাপত্তায় বর্তমানে দুটি টহল দল কাজ করছে। আরও একটি টহল দল বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে রাতভর নজরদারি নিশ্চিত করতে দুটি টহল দল কতটা কার্যকর? টহল দলের অবস্থান, দায়িত্ব বণ্টন ও সাড়া দেওয়ার সময় সম্পর্কে কি নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়? নতুন টহল দল যুক্ত করার পরিকল্পনা কবে বাস্তবায়িত হবে?
শুধু টহল বাড়ানোর আশ্বাস নয়, অপরাধপ্রবণ সময় ও স্থান চিহ্নিত করে দৃশ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
অভিযান চলছে, তবু যাত্রীদের উদ্বেগ কাটছে না; কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চলছে। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ কাজ করছে।
পুলিশের এই বক্তব্যের পাশাপাশি প্রয়োজন অপরাধের পরিসংখ্যান, দায়ের হওয়া অভিযোগের অগ্রগতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মোড়গুলোতে নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতা জনসমক্ষে তুলে ধরা। কারণ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ—দুটি এক বিষয় নয়। অপরাধের ঝুঁকি কমছে কি না, তা বোঝার জন্য প্রয়োজন যাচাইযোগ্য তথ্য ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ।
নিরাপত্তার ফাঁক কোথায়, জবাব দেবে কে?
কুমিল্লার পাঁচ বিশ্বরোডের পরিস্থিতি এখন কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশের মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর? অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না? সন্দেহজনক যানবাহন শনাক্ত এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের করা অভিযোগগুলোর কী অগ্রগতি হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল আশ্বাসে মিলবে না; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান, নথিপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। অথচ এই পথের কয়েকটি মোড়ে রাতে নামা যদি যাত্রীদের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। বুলেট বৈরাগী ও জান্নাতুল তাজমিনের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে।
এখন দেখার বিষয়, কুমিল্লার পাঁচ বিশ্বরোডে নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়। নাকি পরবর্তী কোনো মর্মান্তিক ঘটনার পর আবারও সামনে আসবে একই প্রশ্ন—আর কত প্রাণহানি ঘটলে রাতের যাত্রীরা নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা পাবেন?
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
শোকে স্তব্ধ নাঙ্গলকোটের মাওলানা নাসরুল্লাহ পরিবার
মাহফুজ নান্টুপবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে ৪৫ জনের একটি দলের সঙ্গে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন কুমিল্লার নাঙ...
বুড়িচংয়ে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা ও...
কাজী খোরশেদ আলমকুমিল্লার বুড়িচংয়ে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী...
মুরাদনগরে কন্যাশিশু দিবসে র্যালি আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতর...
বেলাল উদ্দিন আহাম্মদ, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:‘শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’—এই প্র...
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আটক ৩৫৩
আয়েশা আক্তার কুমিল্লা জেলায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা...
দেবিদ্বারে বাস চাপায় তরুণ নিহত
বিশেষ প্রতিনিধিবাবা প্রবাসে থেকেও স্বল্প বেতন আর নানা সংকটে নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারতেন না। ফ...
বুড়িচংয়ে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ বিষয়ে অবহিতকরণ প্রেস ক...
কাজী খোরশেদ আলমকুমিল্লার বুড়িচংয়ে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম বাস্তবায়নে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ বিষ...