প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 5 Aug 2026, 10:18 AM
কুমিল্লার ৪২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, ব্যাহত পাঠদান
জাহিদ পাটোয়ারী, কুমিল্লা
কুমিল্লার প্রায় অর্ধেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। জেলার ২ হাজার ১০৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৯৪টিতে প্রধান শিক্ষক নেই, যা মোট বিদ্যালয়ের ৪২ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের ৯৭০টি পদও শূন্য থাকায় পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সহকারী শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ, আর এর প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শেখার মানে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ না দিলে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা যায় কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি। শতবর্ষী এই স্কুলে গত ১০ বছর ধরে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এ সময়ে পর্যায়ক্রমে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম।
বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ২২৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৬ জন শিক্ষক কর্মরত। ২০২৪ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন মঞ্জুরুল আলম। তিনি বলেন, নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, আর্থিক ও দাপ্তরিক সব কাজই তাকে সামলাতে হয়। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদানে সময় ও মনোযোগ কমে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরাও প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি বিদ্যালয়ে দ্রুত একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় আরও একজন সহকারী শিক্ষক দেওয়ার দাবি জানান।
উত্তর রসুলপুরের মতো একই চিত্র জেলার আরও ৮৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কোথাও সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কোথাও সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য থাকায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এতে শিক্ষক দায়িত্ব বণ্টন, পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিখন কার্যক্রম তদারকি, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক প্রতিবেদন প্রস্তুত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র মতে, জেলায় মোট ২ হাজার ১০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের জন্য অনুমোদিত প্রধান শিক্ষকের পদের সংখ্যা ২ হাজার ১০৭টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র এক হাজার ২১৩ জন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ৮৯৪টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ জেলার ৪২ দশমিক ৪২শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৩ হাজার ৩৮৯টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১২ হাজার ৪১৯ জন। অর্থাৎ ৯৭০টি সহকারী শিক্ষকের পদ এখনো শূন্য রয়েছে।
শূন্যপদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৪১টি, সকারী শিক্ষক ১১টি, লাকসামে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩২টি, সহকারী শিক্ষক ৩৪টি, দেবিদ্বারে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৯৩টি, সহকারী শিক্ষক ১২৪টি, মুরাদনগরে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৯৪টি, সহকারী ৯৩টি, দাউদকান্দিতে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৬০টি, সহকারী ৯২টি, চৌদ্দগ্রামে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৬৭টি, সহকারী ৭৩টি, ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৬০টি সহকারী ৩৯টি, বরুড়ায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩৫টি, সহকারী ১২৭টি, বুড়িচংয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৪৩টি, চান্দিনায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৪৬টি, সহাকারী ৬০টি, হোমনায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৫৪টি, সহকারী ৮টি, নাঙ্গলকোটে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৯৫টি, সহাকারী ৭৭টি, মেঘনায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ২৯টি, সহকারী ২৮টি, মনোহরগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩৩টি, সহকারী ২৮টি, তিতাসে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩৮টি, সহকারী ৫৫টি, সদর দক্ষিণে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ৩৪টি, সহকারী ১৭টি ও লামাই উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ ২২টি এবং সহকারী ৪২টি।
উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম বলেন, ২০১৬ সালে এক বার ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব পালন করছি। এরপর ২০২৪ সালে আবারও দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানও চালিয়ে যাচ্ছি। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও পড়ে। আমরা চেষ্টা করলেও তারা প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত শূন্য প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দীর্ঘ দিনের। আমার বাড়ির সমনে স্কুলটি হওয়ায় নিয়োমিত খোঁজ-খবর রাখি। গত ৫ আগস্টের পর শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঘুরে যোগাযোগের পর ২ জন সহকারী শিক্ষক পেয়েছি আমরা। উপজেলায় এ স্কুলের সুনাম রয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে প্রধান শিক্ষক নেই। ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে বিদ্যালয়টি। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ থাকবে এই স্কুল সহ যে সকল স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই দ্রুত নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে ভুমিকা রাখবেন।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ মিয়া বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের লোড পড়ে বেশি। যার কারণে তারা ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ঠিক ভাবে পাঠদানে সমস্যা হয়। তিনি মনে করেন প্রাথমিক শিক্ষার মজবুতি ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। সে হিসেবে প্রতিটি স্কুলে প্রধান শিক্ষক থাকা জরুরী। একই সঙ্গে দেশের সকল প্রাথমিক স্কুলে এক জন হেড ক্লার্ক প্রয়োজন বলে মনে করেন এই শিক্ষক নেতা।
লাল-সবুজ উন্নয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কাওসার আলম সোহেল বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলার ৪০০টিরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সচেতনতামুলক কাজ করেছি। ৩০ শতাংশ স্কুলেই প্রধান শিক্ষক শূন্য দেখেছি। সে হিসেবে শিক্ষকদের সুখ দুঃখের অনেক গল্প শুনেছি। তার মধ্যে অন্যতম শিক্ষক সংকট। প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের পরিশ্রম বেড়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে শ্রেণি পাঠ দানে। অনকে সময় দেখা যায় শ্রেণি কক্ষে শিক্ষক ফাঁকা। কমলমতি শিক্ষার্থীদের পাড়া-লেখার মান ঠিক রাখতে প্রর্যন্ত শিক্ষক প্রযোজন বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের সমস্যা শুধু কুমিল্লায় না, বরং সারা দেশেই রয়েছে বলে মন্তব্য করেন কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনছুর আলী চৌধুরী। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে সিনিয়র শিক্ষকদেরকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এতে শিক্ষাকার্যক্রমে আমরা কোন ধরণের সমস্যা মনে করি না। কারণ এটা আমার কাছে বড় ধরণের শিক্ষক সংকট মনে হয়না।
তিনি আরও বলেন, আমি যখন সিলেটে চাকরি করি ১৯৯৭ সালে তখন এক জন বা দুই জন শিক্ষকের পদ ছিল বেশির ভাগই। তখন আমরা দেখেছি পড়া-শুনা এতো খারাপ ছিল না। সেই হিসেবে আমার কাছে মনে হয় কুমিল্লায় পর্যাপ্ত। এতে পড়া-লেখার ক্ষতি হচ্ছেনা বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, প্রথমিক শিক্ষা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেখানে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকা মানে সহকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। যার কারণে শিক্ষকরা যখন ক্লাসে নিজের বিষয় শেষ করে অতিরিক্ত বিষয় পড়াতে যান সেখানে ঠিক মতো মনোনিবেশ করতে পারেন না। এতে কমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান মারত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এর প্রভাব বিস্তৃত হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
৮ ব্র্যান্ডের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমে ভয়াবহ মাত্রার মার্কারি শ...
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) পরীক্ষায় ৮টি ব্র্যান্ডের ত্বক ফর্সাকা...
বুড়িচংয়ে অতিথি পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণে প্রশাসনের উদ্যোগ
কাজী খোরশেদ আলমকুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কিশোরনগর গ্রামে পরিযায়ী (অতিথি) পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণে উদ্য...
দালাল ছাড়াই মিলছে ভূমি সেবা, মানুষের আস্থার প্রতীক সদর উপজেল...
আয়েশা আক্তারদালালের পরিবর্তে সরাসরি কর্মকর্তার কাছে সেবা পাচ্ছেন মানুষ, ভূমি অফিসে ফিরেছে সাধারণ মান...
কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সহযোগিতা জোরদার...
আয়েশা আক্তারকৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ...
১২০ বয়সেও কারো মৃত্যু সংবাদ এলে কবর খুঁড়তে চলে যান তারু মিয়া
ফয়সল আহমেদ খান, বাঞ্ছারামপুর ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়লে কি হবে, এখনো ১২...
কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উদযাপন
নিজস্ব প্রতিবেদককুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আলোচনাসভা ও পুরস্কার বিতরন অ...