আয়েশা আক্তার
দালালের পরিবর্তে সরাসরি কর্মকর্তার কাছে সেবা পাচ্ছেন মানুষ, ভূমি অফিসে ফিরেছে সাধারণ মানুষের আস্থা। সরকারি সেবা মানেই দীর্ঘ অপেক্ষা, দালালের দৌরাত্ম্য কিংবা হয়রানির অভিযোগ—এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই রয়েছে। তবে সেই চিত্র বদলে দিয়েছেন কুমিল্লা সদর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা মাশিয়াত আক্তার। সততা, দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন আস্থার আরেক নাম।
সম্প্রতি সরেজমিনে তাঁর কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে দেখা যায়, প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ নানা ধরনের ভূমি-সংক্রান্ত সেবা নিতে আসছেন। কেউ খালি হাতে ফিরছেন না। প্রত্যেকের কথা ধৈর্যসহকারে শুনে দ্রুত প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সমাধান দিচ্ছেন তিনি।
শুধু নিজের কার্যালয় নয়, তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা সাতটি উপজেলা ভূমি অফিসের কার্যক্রমও তিনি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। সিসিটিভির মাধ্যমে বিভিন্ন অফিসে আগত সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সেবার মান নিশ্চিত করছেন। কোথাও কোনো অনিয়ম, হয়রানি বা দেরি হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও রাখছেন কঠোর নজর।
এছাড়া প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত শুনানির দিনে বিপুলসংখ্যক ভূমি-সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। দ্রুত, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী এই কার্যক্রমে সন্তুষ্ট সেবাগ্রহীতারাও।
সেবাগ্রহীতাদের কাছে তিনি প্রশংসায় পঞ্চমুখ , মো. আব্দুল করিম, কুমিল্লা সদর উপজেলার একজন সেবাগ্রহীতা বলেন, আগে মনে হতো ভূমি অফিসে কাজ করতে হলে দালাল লাগবেই। কিন্তু ম্যাডামের কাছে সরাসরি গিয়ে দেখলাম, কোনো দালাল ছাড়াই খুব সহজে কাজ হয়ে গেছে। তিনি নিজেই সব শুনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই কাগজ হাতে পেয়েছি।
নাসরিন আক্তার বলেন, সরকারি অফিসে এত আন্তরিক ব্যবহার আগে পাইনি। ম্যাডাম আমাদের পরিবারের মতো করে কথা বলেছেন। কোথায় কী সমস্যা, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। কোনো হয়রানি হয়নি। খুব অল্প সময়েই কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, আমি অনেক ভয় নিয়ে অফিসে এসেছিলাম। কিন্তু ম্যাডামের ব্যবহার দেখে সেই ভয় কেটে গেছে। তিনি সব কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। আমার নামজারি দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে।
রেহেনা বেগম বলেন, আমার জমির একটি জটিল বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে ছিলাম। ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখেছেন। এখন সমস্যার সমাধান হয়েছে। এমন কর্মকর্তা থাকলে মানুষের কষ্ট অনেকটাই কমে যাবে।
মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এখানে এসে বুঝেছি সরকারি সেবাও সহজ হতে পারে। কোনো অতিরিক্ত টাকা লাগেনি, কোনো তদবিরও করতে হয়নি। সবকিছু স্বচ্ছভাবে হয়েছে।
যা বললেন ভূমি কর্মকর্তা মাশিয়াত আক্তার
এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা মাশিয়াত আকতার বলেন, আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। জনগণের সেবা করাই আমাদের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার। একজন মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, দালালের কাছে যেতে বাধ্য না হন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছভাবে সেবা পান এটাই আমার প্রধান লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, আমি বিশ্বাস করি, একজন নাগরিক সরকারি দপ্তরে এসে যেন সম্মান পান। মানুষের সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং আইন অনুযায়ী দ্রুত সমাধান করে দেওয়া একজন সরকারি কর্মকর্তার নৈতিক দায়িত্ব। যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন, সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাব।
তিনি আরও বলেন ,ভূমি অফিস সম্পর্কে মানুষের যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, সেটি বদলাতে আমরা প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করছি। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সরকারি সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে আমি এবং আমার সহকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
কুমিল্লা সুশীল সমাজের নাগরিক কান্দির পাড় ব্যবসায়ি কল্যকন সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব রোটারিয়ান আবদুর রহমান বলেন, এমন সেবাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এ ধরনের সেবামুখী ও মানবিক প্রশাসনিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সরকারি দপ্তরের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বারব পাবে এবং ভূমি সেবা হবে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও দালালমুক্ত।
তিনি ৩৮তম বিসিএস (প্রশাসন) ব্যাচের একজন কর্মকর্তা।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাশিয়াত আকতার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা ভূমি অফিসে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে যোগদান করেন যোগদানের পর থেকেই তিনি কঠোরভাবে পদক্ষেপ নিয়েছেন দালালমুক্ত করতে।এর পূর্বে তিনি ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখানে সততা এবং নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন, সেখান থেকে বদলি হয়ে কুমিল্লায় আসেন। তিনি সরকারি চাকুরিতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে প্রথম যোগদান করেন ২০২১ সালে।