আয়েশা আক্তার
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে পরিকল্পিতভাবে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। এতে অপ্রতীমের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান এক প্রেস ব্রফিংয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, এ ঘটনায় তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় সিয়াম নামে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে। তার সম্পৃক্ততা নিয়ে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে জিডির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখতে পায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার চারপাশে পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।
পরবর্তীতে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। একটানা জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করে তাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিন জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ ও ফাহাদের এক বন্ধুর সম্পৃক্ততার কথা জানায়। পরে অভিযান চালিয়ে ফাহাদকে হেফাজতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ তার বন্ধু কামরুলের সম্পৃক্ততার কথা জানালে তাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ।
তুহিনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো স্থান অনুযায়ী তার বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন বিকেল আনুমানিক ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দার নির্জন পাহাড়ি বনের মধ্যে অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতীম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রথমে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় আঘাত করে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় সিয়াম নামে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণ যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে অপ্রতীম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত কি না এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, ১। সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ২৪ নং ওয়ার্ড, সানন্দা ( মিশান বাড়ি) নূরে আলম মিয়ার ছেলে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সে কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করলেও ২০২৫ সালে ফেল করার পর পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
২। সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ২৪ নং ওয়ার্ড, সালমানপুর এলাকার মমিন হোসেনের ছেলে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) সে ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
৩। কালির বাজার ইউনিয়নের, হাতিগাড়া এলাকার মো. আব্দুল কুদ্দুস এর ছেলে মো. কামরুল হাসান
৪। সদর দক্ষিণ, এলাহীপুর এলাকার মো. সেলিম মিয়ার ছেলে আটক সিয়াম (১৯), সে আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র বলে জানিয়েছে।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, কিংবা ঘটনার সঙ্গে আরও কোনো বিষয় সংশ্লিষ্ট রয়েছে কি না—সবকিছু গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত শেষ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত পুলিশ প্রতিবেদন (সিএস) বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা হবে।
এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতীমের এমন নির্মম মৃত্যুতে পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।