আয়েশা আক্তার
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামির মধ্যে দুই কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাদের সেখানে পাঠানো হয়।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো দুই কিশোর হলো মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও কামরুল হাসান (১৬)। অপর দুই আসামি তুহিন (১৯) ও সিয়াম (১৯) কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার রাতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশে চার আসামিকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় ফাহাদ ও কামরুলকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খানও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চার আসামিকে কারাগারে হস্তান্তরের পর দুই কিশোরকে সোমবার টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
হত্যার নেপথ্যে শুধু আইফোন ছিনতাই? অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়াকে হত্যার উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তদন্তে আরও কিছু তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরের প্রায় ৫ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও তদন্তকারীদের নজরে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, ফাহাদ অপ্রতিমের বাবার মোবাইল ফোনের দোকানে অল্প কিছুদিন আগে কাজ নিয়েছিল। সেখানে আর্থিক লেনদেন ও প্রায় ৫ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে পরিবারের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ ছাড়া অপ্রতিমের মা এর আগে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার শিলার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। ওই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, কিংবা তুহিন বা অন্য কোনো আসামির সঙ্গে ওই কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ৫ হাজার টাকা পাওনার বিরোধ কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের কোনো সম্পৃক্ততাই এখনো হত্যাকাণ্ডের নিশ্চিত কারণ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি।
লালমাই পাহাড়ে কী ঘটেছিল? তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর তার আইফোন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতিম বাধা দিলে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তুহিন অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। পরে অন্যরাও হামলায় অংশ নেয় বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
এতে ঘটনাস্থলেই অপ্রতিমের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
তবে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, আইফোন নেওয়ার ঘটনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং ৫ হাজার টাকা পাওনার বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য
রোববার দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রাথমিক তদন্তে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরদিকে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আদালত পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাতে সিয়াম ছাড়া অপর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান এ তথ্য জানিয়েছেন।
ফাহাদের স্ট্যাটাস ঘিরে নতুন প্রশ্ন, অপ্রতিম হত্যা মামলার আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি স্ট্যাটাস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওই স্ট্যাটাসে ‘আইফোন’ প্রসঙ্গকে ঘিরে করা মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে।
হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে ওই স্ট্যাটাসের সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর বক্তব্যের সময়কাল, প্রেক্ষাপট এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাস্তব কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—তদন্তেই তা নির্ধারিত হবে।
যেভাবে উদ্ধার হয় অপ্রতিমের মরদেহ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। দীর্ঘ সময় তার কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
পরে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসংলগ্ন লালমাই সানন্দা পাহাড়ের জঙ্গল এলাকা থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিষ্পাপ কিশোর অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন, জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।