আয়েশা আক্তার
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমীন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম নগরী থেকে গ্রেপ্তার করেছে (ডিবি) পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে নতুন আশার সৃষ্টি হলেও কিশোরী তাজমীনের মৃত্যু ঘিরে পরিবার ও স্বজনদের শোক কাটছে না।
শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পুলিশ জানিয়েছে, জান্নাতুল তাজমীনকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির চালক সুমন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্য, ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না এবং তাজমীনের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে।
নিখোঁজের চার দিন পর ধানক্ষেতে মিলল মরদেহ
নিহত জান্নাতুল তাজমীন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা আবদুল আলীম। পরিবারের সঙ্গে সে নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করত। তাদের আদি বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি এলাকায়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমীন। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন স্বজনেরা।
অবশেষে নিখোঁজের চার দিন পর, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
কিশোরী মেয়ের এমন মর্মান্তিক পরিণতি পরিবারকে গভীর শোকের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। যে মেয়েকে ঘিরে ছিল মা-বাবার স্বপ্ন, সেই মেয়ের নিথর দেহ ফিরে পাওয়ার বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
মেয়েকে নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন মা, ছয় মাস স্কুলে যেতে দেননি
তাজমীনের মা জানিয়েছেন, মেয়ের এক বান্ধবীকে ভালো মনে না হওয়ায় তিনি একসময় তাকে ছয় মাস স্কুলে যেতে দেননি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্ব নিয়ে উদ্বেগের কারণে তাকে সব সময় চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন বলেও জানান তিনি।
মায়ের এই বক্তব্যে মেয়েকে নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ও নিরাপত্তার চিন্তার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে তাজমীনের নিখোঁজ হওয়া কিংবা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই বান্ধবীর কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সিএনজি, সিসিটিভি ও লাইভ লোকেশন—তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তাজমীনকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি বিজরা হয়ে রসুলপুর ও শিকারীপাড়া দিয়ে জগতপুরের ঘটনাস্থলে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একটি পরিত্যক্ত সিএনজি এবং তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধারের তথ্য জানায় পুলিশ।
পুলিশ পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তাজমীনের চলাচলের তথ্য অনুসন্ধান করে। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে পদুয়ার বাজার এলাকায় একটি দূরপাল্লার বাস থেকে নামার পর তাকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠতে দেখা যায়। এসব সূত্র ধরে চালক সুমনের পরিচয় শনাক্তের পর চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে, বাবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাজমীন বিপদের মুখে পড়ে বাবার মোবাইল ফোনে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল এবং দ্রুত উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে একটি ভয়েস মেসেজও দিয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানা গেছে। মেয়ের অবস্থান শনাক্ত করে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন বাবা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি।
অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন বাবা আবদুল আলীম। ওই মামলায় সুমনকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, তার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। তাজমীনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
মেয়েকে হারিয়ে বাবার আকুতি—‘সব মেয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে ন্যায়বিচার চাই’
মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন আবদুল আলীম ও তাঁর পরিবার। বাবার কাছে সন্তান হারানোর বেদনা শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষাও।
আবদুল আলীম বলেন, দেশের সব মেয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে আমি ন্যায়বিচার চাই।
তিনি মেয়ের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তাজমীনের মায়ের উদ্বেগ, বাবার আকুতি আর স্বজনদের কান্না—সবকিছু মিলিয়ে পরিবারটির ওপর নেমে এসেছে এক অপূরণীয় শূন্যতা। যে মেয়েকে নিরাপদে বড় করে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা, সেই মেয়ের জন্যই এখন তাঁদের ন্যায়বিচারের অপেক্ষা।
রাজশাহীতে দাদার কবরের পাশে দাফন; শুক্রবার তাজমীনের মরদেহ রাজশাহীতে তার দাদার বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে দাদার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
একটি পরিবারের একমাত্র কন্যাসন্তানকে হারানোর বেদনা ছাড়িয়ে ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে কুমিল্লার সাধারণ মানুষকেও। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ।
বিচারের অপেক্ষায় পরিবার, উত্তর খুঁজছে মানুষ; জান্নাতুল তাজমীনের মৃত্যু ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন এবং কী পরিস্থিতিতে প্রাণ হারাতে হলো এই কিশোরীকে? তার নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগপর্যন্ত কী ঘটেছিল? হত্যাকাণ্ডে শুধু একজন জড়িত, নাকি এর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে?
তাজমীনের পরিবার চায় না, তাদের মেয়ের মৃত্যুর বিচার কেবল একটি সংবাদ শিরোনাম হয়ে থাকুক। তারা চায় প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হোক, অপরাধে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের আওতায় আসুক এবং আর কোনো পরিবারকে যেন এভাবে সন্তান হারানোর শোক বয়ে বেড়াতে না হয়।
জান্নাতুল তাজমীনের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়—এটি শিশু-কিশোরীদের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠারও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।