প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 25 Oct 2026, 10:12 AM
গোমতীর স্রোতের সঙ্গে হারিয়েছে চারশ বছরের মালাপাড়া বাজারের ঐতিহ্য
মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি।।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার গোমতী নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রায় চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী মালাপাড়া বাজার এখন অস্তিত্বসংকটে। একসময় এ অঞ্চলের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল বাজারটি। সপ্তাহে দুই দিন বসত জমজমাট হাট। দূরদূরান্ত থেকে নৌকায় পণ্য নিয়ে আসতেন ব্যবসায়ীরা। মাছ, পাট, ধান, চাল, আলু থেকে শুরু করে গরু-ছাগল—সবকিছুরই বেচাকেনা হতো এখানে। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট এখন জরাজীর্ণ। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাত্র তিনটি চায়ের দোকান টিকে আছে বাজারটির অস্তিত্বের সাক্ষী হয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় খরস্রোতা গোমতী নদী ছিল এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান যোগাযোগমাধ্যম। নদীপথে সহজে পণ্য পরিবহনের সুবিধায় মালাপাড়া বাজারের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দূরদূরান্তে। শনিবার ও মঙ্গলবার সাপ্তাহিক হাটের দিনে ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু নদীর নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন এবং আশপাশে নতুন বাজার গড়ে ওঠায় ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায় বাজারটি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মালাপাড়া বাজারটি সরকারের ইজারাভুক্ত। প্রতিবছর অন্যান্য বাজারের সঙ্গে এ বাজার ইজারার জন্যও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। উপজেলার অন্য বাজারগুলো ইজারা নিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও মালাপাড়া বাজারের ক্ষেত্রে চিত্র উল্টো। গত কয়েক বছর ধরে বাজারটি ইজারা নিতে কেউ আবেদন করছেন না। সরকারি নথিতে বাজারটির অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, একসময় বাজারটিতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের গুদাম, বরফকল এবং চাল-আটার মিলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল। সাপ্তাহিক হাটে মাছ, সবজি, পাট, গরু-ছাগল, ধান, গমসহ নানা কৃষিপণ্যের বেচাকেনা হতো। এখন সেই ব্যস্ততা নেই। বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে। ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা নেই বললেই চলে। বিশাল বাজারের মধ্যে চালু রয়েছে মাত্র তিনটি চায়ের দোকান, সেগুলোও খোলা হয় সকাল ও বিকেলে।
মালাপাড়া গ্রামের প্রায় শতবর্ষী বাসিন্দা আব্দুল মজিদ তিতু মেম্বার অতীতের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘একসময় এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল মালাপাড়া বাজার। গোমতী নদীতে ছোট-বড় অনেক নৌকা চলত। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ পণ্য কেনাবেচা করতে আসতেন। এখানে পাটের বড় বাজার ছিল। পাশাপাশি চাল, আলু, মাছ ও গরুর হাট বসত। এমন কোনো পণ্য ছিল না, যা এ বাজারে পাওয়া যেত না। আমার নিজেরও এখানে দোকান ছিল। ভালো আয়-রোজগার হতো। এখন সেই বাজার প্রায় পরিত্যক্ত।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী আমির হোসেন বলেন, তাঁর বাবা-দাদার কাছ থেকে শুনেছেন, বাজারটি তিনশ বছরেরও বেশি পুরোনো। একসময় সুনাম থাকা বাজারটি এখন প্রায় জনশূন্য। সপ্তাহে দুই দিন হাট বসার কথা থাকলেও এখন আর বসে না। নতুন করে কেউ দোকান নিয়ে ব্যবসা করতেও আসেন না। তিনি বলেন, ‘বাবা-দাদার স্মৃতি ধরে রাখতে আমিও এখানে ব্যবসা করছি। বর্তমানে আমার দোকানসহ মাত্র তিনটি চায়ের দোকান রয়েছে। সেগুলোও শুধু সকাল ও বিকেলে খোলা হয়।’
ষাটোর্ধ্ব আব্দুল আজিজ একসময় বাজারে আসা পাইকারদের মালামাল বহন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি বলেন, আগে দূরদূরান্ত থেকে পাইকারেরা পাট, আলু, চাল, ডাল ও মাছ কেনাবেচার জন্য আসতেন। গরু-ছাগলেরও বেচাকেনা হতো। এসব পণ্য বহন করেই তিনি সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু বাজারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর মতো অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। বাজারটি আবার চালু হলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন তিনি।
বাজারটির দুরবস্থার পেছনে কয়েকটি কারণের কথা তুলে ধরেন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক কাজী আব্দুল আলীম। তিনি বলেন, গত ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে বাজারটির অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। তাঁর ভাষ্য, হাটে আসা বহিরাগত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেশি খাজনা আদায় এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে মাঠে গরু-ছাগলের হাট বসতে না পারায় বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া একসময় গোমতী নদীপথে দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা আসতেন। এখন বর্ষা মৌসুমেও নদীতে আগের মতো পানি থাকে না। নৌপথের গুরুত্ব কমে যাওয়াও বাজারটির ঐতিহ্য হারানোর অন্যতম কারণ।
মালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। কংশনগর বাজারের কাছে গোমতী নদীর ওপর সেতু নির্মিত হওয়ায় এ এলাকার মানুষ সহজেই অন্য বাজারে যাতায়াত করতে পারেন। সামান্য কেনাকাটার জন্যও অনেকে কংশনগর বাজার, ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট এলাকা কিংবা কুমিল্লা শহরে চলে যান। এ ছাড়া ইউনিয়নের রামনগর, আসাদনগর কলেজ গেট, অলুয়া মোড় ও চৌমুহনীতে সকাল-বিকেলে বাজার বসে। ফলে মালাপাড়া বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম কমে গেছে।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, মালাপাড়া বাজারে নির্ধারিত দিনে সাপ্তাহিক হাট চালুর চেষ্টা করছেন তিনি। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে এবং আগের মতো ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগম ঘটানো গেলে বাজারটির ঐতিহ্যের কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কয়েক গ্রামের মানুষের সুবিধার পাশাপাশি কয়েকশ বছরের পুরোনো এ বাণিজ্যকেন্দ্র পুনরুজ্জীবিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর দাবি, বাজারটিতে অন্তত সপ্তাহে দুই দিন হাট বসানোর ব্যবস্থা করা হোক। এতে স্থানীয় কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। তাঁদের প্রত্যাশা, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে গোমতীর তীরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী মালাপাড়া বাজার আবারও ফিরে পাবে তার হারানো প্রাণচাঞ্চল্য।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
কুমিল্লা নগরীতে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল সাবেক সভাপতি, ইউপি স...
মাহফুজ নান্টুকুমিল্লা নগরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় ম...
ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মাঠপর্যায়ে কুসিক প্রশাস...
আয়েশা আক্তার ডেঙ্গু প্রতিরোধে নগরজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করেছে কুমিল্লা সি...
বুড়িচংয়ে জামগাছের ডাল কাটতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বিএনপি নেতা...
কাজী খোরশেদ আলমকুমিল্লার বুড়িচংয়ে জামগাছের ডাল কাটতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মো. রফিকুল ইসলাম (৬০) ন...
কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তে মাদকসহ ১ কোটি ৫ লাখ টাকার...
মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি।।কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সীমান্তবর্তী...
ময়নামতিতে দিন দিন বেড়েই চলছে অপরাধ; এবার ডাকাতের কবলে প্রবাস...
কুমিল্লা উত্তর প্রতিনিধিকুমিল্লার বুড়িচংয়ে ডাকাতের কবলে পড়েছেন আবুল কালাম নামে এক প্রবাস ফেরত যুবক...
বরুড়ায় বৃদ্ধের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার
বরুড়া প্রতিনিধিকুমিল্লার বরুড়া উপজেলার শাকপুর ইউনিয়নের চৌওড়ী গ্রামে মোবারক হোসেন (৮০) নামে এক...