আয়েশা আক্তার
নতুন লিফট স্থাপনের দাবিতে আইনজীবীদের আবেদন! দশতলা ভবনে লিফট অচল, সিঁড়িই এখন ভরসা, বয়স্ক ও অসুস্থ বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ চরমে, প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভোগান্তি, দ্রুত সমাধানের দাবি।
কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের দুটি লিফট দীর্ঘদিন ধরে বিকল ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, বিচারক, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। দশতলা বিশিষ্ট এই আদালত ভবনের জরাজীর্ণ লিফট দুটি দ্রুত সংস্কার অথবা নতুন লিফট স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবী ও বিচার প্রার্থীরা।
দাউদকান্দি থেকে আসা বয়োজ্যেষ্ঠ আলতাফ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় ভবনে নষ্ট লিফট লাগিয়ে রাখা হয়েছে, এটা কেমন কথা? আমরা অনেক দূর থেকে আসি। সরকার যেন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে।
বিচারপ্রার্থী আমেনা বেগম বলেন, এত বড় আদালতে যদি লিফটের এমন বেহাল অবস্থা থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে সেবা পাবে?
আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান বলেন, আমাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জরাজীর্ণ লিফট স্থাপন করা এবং তা বছরের পর বছর অচল রাখা চরম অব্যবস্থাপনার পরিচয়।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, কুমিল্লা আদালতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসেন। এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের লিফট স্থাপন করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা করিম মিয়া বলেন, কুমিল্লার আদালত একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। এখানে নিম্নমানের কাজ যারা করেছেন এবং যাদের তদারকির দায়িত্ব ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কান্দিরপাড় ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি রোটারিয়ান আলহাজ মো. আবদুর রহমান বলেন, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে ওঠানামা করেন। এমন একটি ভবনের দুটি লিফট অচল হয়ে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক। কেন লিফটগুলো নষ্ট হলো, তা আগে তদন্ত করে দেখাহোক। টেন্ডার প্রক্রিয়া বা নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কুমিল্লা জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. কাইমুল হক রিংকু বলেন, যেদিন এই দশতলা ভবনটি উদ্বোধন করা হয়, সেদিন তৎকালীন আইনমন্ত্রী নিজেই লিফটে আটকা পড়েছিলেন। আমিও একাধিকবার লিফটের ভেতরে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধার করেছি। লিফটের ভেতরের লাইট পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে। বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের জানানো হলে তারা এসে পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
তিনি আরও বলেন, লিফট দুটি একেবারেই খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বহুবার সংস্কার করা হলেও সেগুলো ব্যবহার উপযোগী হয়নি। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া টু চাঁদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আদালতে আসেন। অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন, যাদের পক্ষে ১০ তলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে ওঠা-নামা করা সম্ভব নয়। তাই আমরা কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে গণপূর্ত বিভাগে অভিযোগ জানিয়েছি এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের কাছে নতুন লিফট স্থাপনের আবেদন করেছি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান হিরা জানান, আদালত ভবনের দুটি লিফট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সমস্যায় রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকৌশলীরা লিফট দুটি পরিদর্শন করেছেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় মেরামত ও সংস্কার করে আসা হচ্ছে, এবং এ ক্যাটাগরির নতুন ২টি লিফট স্থাপনের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, লিফট দুটি ২০১৮ সালে স্থাপন করা হলেও ২০২০ সালে চালু করা হয়। ওই সময় থেকে প্রতি মাসে এর রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। এই দুটি লিফটের পেছনে বছরে প্রায় ৭ লাখ টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং লিফটম্যানদের বেতন বাবদ আরও প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ হয়। এটি নন-ক্যাটাগরির লিফট। নতুন করে একই ধরনের এ ক্যাটাগরির লিফট স্থাপন করতে হলে প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।
নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, গত আট মাসে চারবার লিফট দুটি মেরামত করা হয়েছে। তবে যারা লিফটের কাজের ঠিকাদারি পেয়েছিলেন, তাদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা ফাইল পর্যালোচনা ও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। লিফটম্যানদের অবহেলার কারণেও অনেক সময় যান্ত্রিক ক্ষতি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতাল, সার্কিট হাউস এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের লিফটের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের। আদালতের দুটি নতুন লিফট স্থাপনের জন্য আমরা একাধিকবার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। আশা করছি, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন লিফটের অনুমোদন পাওয়া যাবে। এর আগে পর্যন্ত পুরোনো লিফটগুলো সচল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা রয়েছে আমাদের।
আদালত সংশ্লিষ্টরা দ্রুত লিফট দুটি মেরামত অথবা নতুন লিফট স্থাপনের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।