কাজী খোরশেদ আলম
কুমিল্লার বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। সবজি, মাছ, মাংস, মুদি পণ্য থেকে শুরু করে ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্য কেনাবেচায় অবাধে ব্যবহার হচ্ছে পলিথিন। পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং আইনত নিষিদ্ধ হলেও এর ব্যবহার বন্ধে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় সচেতন মহলের। ফলে একদিকে বাড়ছে পরিবেশদূষণ, অন্যদিকে পাটজাত ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার কমে যাচ্ছে।
সরেজমিনে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকান ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ক্রেতাদের পণ্য পলিথিনে করে দিচ্ছেন। বাজারে মাছ-মাংস, শাকসবজি, মুদি পণ্য ও ফলমূল বিক্রির ক্ষেত্রে পলিথিন যেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বুড়িচংয়ের জরুইন গ্রামের ফল বিক্রেতা মফিজ মিয়াও ক্রেতাদের পলিথিনে ফল সরবরাহ করেন।
ফল বিক্রেতা মফিজ মিয়া বলেন, ‘‘গ্রাহকরা কাগজের কার্টনের চেয়ে পলিথিন বেশি পছন্দ করেন। তাই পলিথিন ব্যবহার করছি।’’
সচেতন মহলের মতে, পলিথিন সহজে পচনশীল নয়। দীর্ঘদিন মাটির নিচে পড়ে থাকলেও এটি সহজে নষ্ট হয় না। ফলে মাটির উর্বরতা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। আবার পলিথিন পুড়িয়ে ফেললেও বায়ুদূষণসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
একসময় বাংলাদেশে পাটকে বলা হতো ‘সোনালি আঁশ’। পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে দেশ উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই পাটের তৈরি ব্যাগসহ বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারের প্রচলন ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পলিথিনের সহজলভ্যতা ও ব্যাপক ব্যবহারের কারণে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে।
পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০’-এর আওতায় নির্দিষ্ট পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহারের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি পাট ও পাটবীজ উৎপাদন বাড়ানো, চাষিদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা এবং বহুমুখী পাটজাত পণ্যের ব্যবহার সম্প্রসারণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের (জেডিপিসি) মাধ্যমে বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব পাটজাত ব্যাগ, মোড়ক ও অন্যান্য পণ্য বাজারে সহজলভ্য করা গেলে পলিথিনের বিকল্প তৈরি হবে এবং একই সঙ্গে পাটশিল্পও লাভবান হবে।
এদিকে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার বিভিন্ন বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ ব্যবহার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির কারণে পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তারা বাজারগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, পলিথিনের উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ এবং পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাট, কাগজ ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাজারের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে এবং ভবিষ্যতে পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আলোকিত মানুষ এবং বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠীনের প্রতিষ্ঠাতা মোশারফ হোসেন খান চৌধূরী বলেন, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের প্রতিটি বাজারে নিয়মিত মনিটরিং করে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মোঃ আতিকুর রহমান বলেন, পলিথিন পচনশীল বস্তু নয়। তাই এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বস্ত। পলিথিন জমির উর্বরতা কমিয়ে দেয় - এতে ফলন কম হয়। কোন কোন সময় গরু খাবারের সাথে পলিথিনের টুকরো খেয়ে ফেলে। এতে গরুর পেট ফুলে যায় এবং গরু মারা যেতে পারে। সকলকে পলিথিনের ব্যবহার বর্জন করে পাটজাত দ্রব্য ব্যবহারের আগ্রহী হওয়া দরকার। এতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ দুটিই রক্ষা হবে।
বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মালেকুল আফতাব বলেন, সর্বদাই পলিথিন বর্জন করে চলা উচিত। পলিথিনের মধ্যে খাবার বেশিক্ষণ রাখলে খাবারের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে খাদ্যজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। পলিথিনের ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে বলেও জানান তিনি।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভীর হোসেন বলেন,বুড়িচংয়ে পলিথিন উৎপাদনকারী কোন প্রতিষ্ঠাণ নেই। সরকারী আইন অনুযায়ী পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় বিভিন্ন সময় মোবাইল কোটের মাধ্যমে নিবারনের চেষ্টা করা হচ্ছে। পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে হাট-বাজারগুলোতে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।পলিথিন উৎপাদনের কোন তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।