আয়েশা আক্তার
কুমিল্লা নগরীর ইসলামপুরে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের সামনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও অঙ্গসংগঠনের সমর্থনে মিছিল, বিভিন্ন স্লোগান, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে পুলিশ। একই মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৩ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার নম্বর-৩৭ এবং বার্ষিক নম্বর-৬৯৯।
মামলার বাদী কোতয়ালী মডেল থানার এসআই (নিরস্ত্র) ওমর ফারুক। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর কোতয়ালী মডেল থানার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নম্বর-৩১৭-এর সূত্রে সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যদের নিয়ে দিবাকালীন মোবাইল-১ ডিউটিতে ছিলেন।
এজাহারে বলা হয়, ওইদিন বিকেল আনুমানিক ৫টা ৫ মিনিটের দিকে পুলিশ সদস্যরা শাসনগাছা এলাকায় অবস্থানকালে থানার ডিউটি অফিসারের মাধ্যমে খবর পান, কোতয়ালী মডেল থানাধীন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুরে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের সামনে একদল ব্যক্তি জড়ো হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে।
পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, বুড়িচং উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনকে বৈষম্যবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তারের পর আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল। আদালতের কার্যক্রম শেষে তাকে কুমিল্লা জেলা কারাগারে নেওয়ার জন্য পুলিশি প্রহরায় গাড়িতে তোলার সময় কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ৪০ থেকে ৫০ জন সক্রিয় সদস্য সেখানে জড়ো হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তিরা নিষিদ্ধ সংগঠনের সমর্থনে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন এবং নাশকতার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ডে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় বলে অভিযোগ পুলিশের।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, খবর পাওয়ার পর কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জের সঙ্গে আলোচনা করে এসআই ওমর ফারুক সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে বিকেল আনুমানিক ৫টা ২৫ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯ জনের নাম উল্লেখ: মামলার এজাহারে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন—
১. আবু ইউসুফ (৫৫) — যুগ্ম সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ, কুমিল্লা। পিতা-মৃত মো. তফাজ্জল হোসেন। সাং-লগ্নসার, থানা-বরুড়া, জেলা-কুমিল্লা।
২. আবদুল আলীম (৪২) — আইন বিষয়ক সম্পাদক, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা। পিতা-মৃত আবদুর রহমান। সাং-ছয়গ্রাম, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা।
৩. নসরুল হাসান অপু (৩৫) — সদস্য, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী ঐক্য পরিষদ, কুমিল্লা। পিতা-ফরিদ আহমেদ। সাং-রেইসকোর্স, থানা-কোতয়ালী মডেল, জেলা-কুমিল্লা।
৪. আছিয়া মেহজাবিন খাঁন নিশু (৪২) — যুগ্ম সম্পাদক, কুমিল্লা মহানগর যুব মহিলা লীগ। পিতা-এ এম ইসমাইল খাঁন। সাং-মুন্সেফ কোয়ার্টার, ১ নম্বর ওয়ার্ড, কুসিক, থানা-কোতয়ালী মডেল, জেলা-কুমিল্লা।
৫. শাহ আলম (৩৫) — সাবেক সহ-সভাপতি, কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগ। পিতা-শামসুল হক। সাং-মাধবপুর, মোকাম ইউপি, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা।
৬. আলমগীর হোসেন (৩৮) — সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বুড়িচং উপজেলা ছাত্রলীগ। পিতা-আব্দুস সাত্তার। সাং-রামনগর, ষোলনল ইউপি, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা।
৭. জালাল আহম্মেদ সাজু (৫০) — আইন বিষয়ক সম্পাদক, কুমিল্লা দক্ষিণ যুবলীগ। পিতা-সিরাজুল ইসলাম। সাং-শিয়ালোড়া, থানা-বরুড়া, জেলা-কুমিল্লা।
৮. মো. জাহাঙ্গীর আলম ভূইয়া — সদস্য, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ। পিতা-আলী আহম্মেদ ভূইয়া। সাং-মনোহরপুর, অশুয়া/অনুয়া, থানা-ব্রাহ্মণপাড়া, জেলা-কুমিল্লা।
৯. রেজাউল করিম খোকন (৫২) — সাবেক বুড়িচং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক, বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগ। পিতা-মৃত ছিদ্দিকুর রহমান। সাং-গাজীপুর খাড়াতাইয়া, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা।
১০. সাইফুল ইসলাম ভূইয়া (৫৩) — যুগ্ম সম্পাদক, বুড়িচং উপজেলা যুবলীগ। পিতা-মৃত শাহাজাহান ভূইয়া। সাং-১৬৬০, রেইসকোর্স, থানা-কোতয়ালী মডেল, জেলা-কুমিল্লা।
১১. মেজবাহ উদ্দিন জনি (৩২) — পিতা-মুকবুল হোসেন। সাং-শিকারপুর, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা।
১২. সাইফুল ইসলাম সানি (২৬) — পিতা-মুকবুল হোসেন। সাং-শিকারপুর, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা।
১৩. রেজাউল করিম শাওন (২৫) — সাবেক সহ-সম্পাদক, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। পিতা-কবির হোসেন। সাং-ছোটরা মফিজাবাদ কলোনী, থানা-কোতয়ালী মডেল, জেলা-কুমিল্লা।
১৪. সানি খন্দকার (৩৬) — মহানগর যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পিতা-মৃত শহিদ খন্দকার। সাং-দক্ষিণ চর্থা, থানা-কোতয়ালী মডেল, জেলা-কুমিল্লা।
১৫. তারেক (৩২) — পিতা-মোস্তফা কামাল। সাং-মনোহরপুর, থানা-কোতয়ালী মডেল, জেলা-কুমিল্লা।
১৬. রাজন (২৮) — পিতা-আক্তার হোসেন। সাং-কুচাইতলী গোল্ডেন সিটি, থানা-কোতয়ালী মডেল, জেলা-কুমিল্লা।
১৭. মোস্তাফিজুর রহমান লিটন (৫৬) — সদস্য সচিব, কুমিল্লা বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ। পিতা-মৃত ছিদ্দিকুর রহমান। সাং-দক্ষিণ বাগিচাগাঁও, থানা-কোতয়ালী মডেল, জেলা-কুমিল্লা।
১৮. মো. ইসমাইল (৩০) — সাবেক সভাপতি, নিমসার কলেজ ছাত্রলীগ। পিতা-অজ্ঞাত। সাং-মাধবপুর, মোকাম ইউপি, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা।
১৯. মো. ইমন (২৬) — ছাত্রলীগ নেতা, নিমসার কলেজ শাখা। পিতা-মোসলেম উদ্দিন। সাং-মাধবপুর, মোকাম ইউপি, থানা-বুড়িচং, জেলা-কুমিল্লা।
এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
যে অভিযোগ আনা হয়েছে; এজাহারে পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্য হিসেবে সংগঠনের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে মিছিল করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তারা অপরাধ সংগঠনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে অপরাধ সংঘটনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রচার, প্রসার ও প্ররোচিত করার উদ্দেশ্যে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কার্যকলাপে অংশ নেন।
এজাহারে দাবি করা হয়েছে, আসামিরা আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেন। এর মাধ্যমে সরকারের প্রতি জনমনে ঘৃণা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয় বলে পুলিশের অভিযোগ।
নেতৃত্ব ও নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ; এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা মামলার ১ থেকে ৪ নম্বর আসামির নির্দেশ ও নেতৃত্বে পরস্পর যোগসাজশে কথিত কর্মকাণ্ডে অংশ নেন বলে পুলিশ অভিযোগ করেছে।
পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা নিষিদ্ধ সংগঠনের সমর্থন, কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও উৎসাহিত করা এবং সরকারের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে জনমনে ঘৃণা ও আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আসামিরা ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৩ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারে অভিযান, পরে মামলা; এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার পর পুলিশ স্থানীয়ভাবে এবং বিশ্বস্ত গোপন সূত্রের মাধ্যমে এজাহারনামীয় আসামিদের নাম-ঠিকানা শনাক্ত করার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে পলাতক আসামি ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশ আরও জানায়, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরে থানায় এসে এজাহার দায়ের করা হয়েছে। এ কারণে মামলা করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে এজাহারে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে কোতয়ালী মডেল থানার এসআই মো. মামুন ভূইয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এজাহারে বাদী এসআই ওমর ফারুক উল্লেখ করেন, পলাতক এজাহারনামীয় আসামিদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ৩০ জনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিয়মিত মামলা রুজুর আবেদন করা হয়েছে।