স্টাফ কোয়ার্টার
মামলা করেছেন, আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, আদালত থেকেও পেয়েছেন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা—তবুও যেন নিরাপত্তা মিলছে না কুমিল্লার মওদুদ আব্দুল্লাহর। বরং মামলা দায়েরের পর থেকেই একের পর এক হুমকি, অপহরণের চেষ্টা, চাঁদাবাজির চাপ এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারির অভিযোগে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটানোর দাবি করেছেন তিনি।
তার অভিযোগ, মামলা-মোকদ্দমার কারণে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাকে টার্গেট করেছে। কখনো প্রশাসনের লোক পরিচয়ে, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে মামলা আপসের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি তার গতিবিধির ওপর নজরদারি, প্রাণনাশের হুমকি এবং অপহরণের চেষ্টাও করা হচ্ছে বলে দাবি তার।
এসব অভিযোগের প্রতিকার ও নিজের নিরাপত্তা চেয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন মওদুদ আব্দুল্লাহ (৩৭)। তিনি কুমিল্লা নগরীর ইসলামপুর (পুরাতন চৌধুরীপাড়া) এলাকার বাসিন্দা।
আদালতের আদেশ, তবুও কেন থামছে না হুমকি? মওদুদ আব্দুল্লাহর আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোতয়ালী মডেল থানার মামলা নং-৪১, জিআর নং-৮৫০, তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২৪-এ দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৪২/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৪২৭/৩৮৫/৫০৬(২)/৩৪ ধারায় মামলা করা হয়।
মামলাটিতে হত্যার উদ্দেশ্যে জখম, চাঁদাবাজি, মারধর, ভাঙচুর ও হুমকিসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করেন তিনি। মামলাটি চলমান থাকা অবস্থায় তাকে মামলা আপস করে নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়ার অভিযোগ করেন মওদুদ। তার দাবি, একটি চক্র প্রশাসনের লোক পরিচয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং পরবর্তীতে ভয়ভীতি দেখায়।
শুধু তাই নয়, তাকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ করে মওদুদ বলেন, ঘটনাটি আদালতের নজরে এলে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে আদালতের একাধিক স্মারক ও আদেশের কথাও আবেদনে উল্লেখ করেছেন তিনি।
প্রশ্ন উঠছে—আদালতের নির্দেশনার পরও যদি একজন মামলার বাদী নিজেকে নিরাপত্তাহীন মনে করেন, তাহলে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে কে? মামলা বাড়ছে, কমছে না আতঙ্ক
মওদুদের আবেদনে আরও উল্লেখ রয়েছে, কোতয়ালী মডেল থানার মামলা নং-৫১, জিআর নং-৮১২, তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০২৫-এ দণ্ডবিধির ৩৯২/৩৪ ধারায় মামলা করা হয়েছে। তার অভিযোগ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে একাধিক ব্যক্তি তার ওপর দস্যুতা বা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়ে একটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে যায়।
তার দাবি, ওই মোবাইল ফোন ও ক্যামেরায় তার পেশাগত কাজের গুরুত্বপূর্ণ ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্টারি, সরকারি প্রেস রিলিজসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় নথি ছিল। ছিনতাই হওয়া ওই ডিভাইসের তথ্য ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এমনকি তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন হ্যাক করে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখারও অভিযোগ করেছেন।
‘মামলা করার পর ৩৮টি অপরাধের শিকার’
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো—মওদুদের দাবি, মামলা দায়েরের পর থেকে তাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩৮টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে অজ্ঞাতনামা ও মামলার সংশ্লিষ্ট আসামিদের যোগসূত্র রয়েছে বলে তিনি সন্দেহ করছেন।
‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়’ ব্যবহার করে ভয় দেখানোর অভিযোগ মওদুদের অভিযোগে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অপরাধীরা বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা প্রশাসনের পরিচয় ব্যবহার করছে। তার দাবি, এ ধরনের পরিচয় ব্যবহার করে তাকে মামলা তুলে নেওয়া কিংবা আপস করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এতে শুধু তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন; মওদুদ আব্দুল্লাহর আবেদনে আদালতের পক্ষ থেকে দেওয়া নির্দেশনার কথা উল্লেখ থাকলেও সেসব নির্দেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না এবং তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মামলার বাদী যদি আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পরও অপরাধীদের ভয়ে চলাফেরা করতে বাধ্য হন, তাহলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরই বর্তায়। বিশেষ করে মামলার বাদীকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক হুমকি বা অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রতিটি জিডি ও অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
‘অপরাধীদের ভয়ে জীবন পার করতে হচ্ছে’
মওদুদের ভাষ্য, মামলা করার পর থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও গেলে তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, ফোনে কথা বললে তা নজরদারি করা হচ্ছে কি না, কিংবা হঠাৎ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে কি না—এমন আতঙ্ক নিয়েই দিন কাটছে তার।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে আসল রহস্য
মওদুদ আব্দুল্লাহর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অপহরণের চেষ্টা, প্রাণনাশের হুমকি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সাইবার অপরাধ, মোবাইল হ্যাকিং ও নজরদারির মতো গুরুতর বিষয়। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে থানায় থাকা জিডি, মামলা, আদালতের আদেশ, সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইলস ও ডিজিটাল ফরেনসিকসহ সংশ্লিষ্ট আলামত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় মওদুদ আব্দুল্লাহর দাবি, তার দায়ের করা জিডিগুলো দ্রুত তদন্ত, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ক্যামেরা উদ্ধারের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
তার প্রশ্ন একটাই—মামলা করে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার পরও যদি অপরাধীদের হুমকির ভয়ে জীবন পার করতে হয়, তাহলে আইনি ও প্রশাসনিক নিরাপত্তার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কে নেবে?