আয়েশা আক্তার।।
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে সরকার যখন দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে, তখন কুমিল্লা নগরীতে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে দিনরাত কাজ করছে সিটি করপোরেশন। ডেঙ্গুমুক্ত নগরী গড়তে পরিচ্ছন্নতা, পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
কিন্তু নগরীর বাগিচাগাঁও রানীর বাজার এলাকার ডেলমন প্রকল্পে গিয়ে মিলেছে যেন সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।
একদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি দপ্তরগুলোর তৎপরতা, অন্যদিকে ডেলমনের প্রকল্প এলাকায় জমে থাকা পচা-দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানি, ময়লা-আবর্জনা ও নোংরা পরিবেশ। কোথাও বেজমেন্টজুড়ে পানি, কোথাও আবর্জনার স্তূপ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি যেন এডিস মশার জন্য সম্ভাব্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—সরকার যেখানে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেখানে ডেলমন কি সেই যুদ্ধের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে বসেছে?
একদিকে প্রশাসনের যুদ্ধ, অন্যদিকে ডেলমনের ‘উল্টো অভিযান’
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালেই কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মতবিনিময় সভা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ২৭টি ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ওয়ার্ড সচিবরা অংশ নেন।
নগরবাসীকে ডেঙ্গুর হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সিটি প্রশাসনের এমন তৎপরতার মধ্যেই একই দিন কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অভিযানে ডেলমন প্রকল্পের ভেতরের চিত্র সামনে আসে।
অভিযানিক দলের পরিদর্শনে প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পচা পানি, ময়লা-আবর্জনা ও নোংরা পরিবেশ দেখা যায়। কোথাও কোথাও জমে থাকা পানিতে মৃত মাছ পচে ভেসে থাকতেও দেখা গেছে।
এমন দৃশ্য দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ডেঙ্গু প্রতিরোধে যখন পুরো প্রশাসন মাঠে, তখন একটি বড় আবাসন প্রকল্পের ভেতরে এমন পরিবেশ কীভাবে দিনের পর দিন টিকে থাকে?
ডেলমনের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ক্ষোভ
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলেও তা নিয়মিত অপসারণ করা হয়নি। ফলে মশার উৎপাত বেড়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা আশপাশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী থাকার দাবিও করেছেন। তবে এ দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাদের ভাষ্য, প্রকল্পের ভেতরে পানি জমে থাকলে তার প্রভাব শুধু প্রকল্পের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; আশপাশের বসতিতেও মশার উপদ্রব বাড়তে পারে।
প্রশ্ন করতেই প্রকৌশলীর উত্তেজিত আচরণ
অভিযানের সময় ডেলমন প্রকল্পের প্রকৌশলী ইমরানকে জমে থাকা পানি, পানি নিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে উত্তেজিতভাবে কথা বলেন।
তিনি পানি নিষ্কাশনে স্থানীয় কিছু বখাটে ছেলেদের কারণে সমস্যা হচ্ছে বলে দাবি করেন।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—কারণ যা-ই হোক, একটি বড় আবাসন প্রকল্পের ভেতরে দিনের পর দিন পচা পানি ও আবর্জনা পড়ে থাকবে কেন?
জনস্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি সামনে আসার পরও যদি পানি অপসারণ ও পরিচ্ছন্নতার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে দায় এড়ানোর সুযোগ কতটা—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে কেডিএ চেয়ারম্যানের কঠোর পদক্ষেপ ডেলমনের পরিস্থিতি কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবুর নজরে এলে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন।
পরিস্থিতি দেখে ডেলমনের সব প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে জমে থাকা পচা পানি দ্রুত অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং মশক নিধনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ সময় কেডিএ চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু বলেন, দেশে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, এই প্রকল্পে দেখছি উল্টো চিত্র।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘বিপরীত চিত্র’ কেন?
বর্তমানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচ্ছন্নতা ও জমে থাকা পানি অপসারণে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনও ২৭টি ওয়ার্ডে কার্যক্রম জোরদার করেছে।
কিন্তু সেই একই নগরীতে একটি বড় প্রকল্পের ভেতরে যদি পচা পানি, আবর্জনা ও মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে পুরো নগরীর ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সিটি প্রশাসন যখন ডেঙ্গুমুক্ত নগরীর জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে কাজ করছে, তখন ডেলমন যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রের নাম।
এ যেন একদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের সরকারি অভিযান, অন্যদিকে অপরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে সেই উদ্যোগের সঙ্গে এক ধরনের ‘প্রতিযোগিতা’!
এখন নগরবাসীর প্রশ্ন—ডেলমনের মতো বড় প্রকল্পগুলোতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? এতদিন ধরে এমন পরিস্থিতি থাকলেও সংশ্লিষ্টদের নজরে কেন আসেনি?
কেডিএর নির্দেশনার পর ডেলমন কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, জমে থাকা পানি ও আবর্জনা কত দ্রুত অপসারণ করে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি পুনরায় তৈরি না হওয়ার জন্য কী স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়—এখন সেদিকেই নজর নগরবাসীর।
আরও শক্ত করতে চাইলে শিরোনাম হতে পারে:
ডেঙ্গু ঠেকাতে সরকার মরিয়া, ডেলমনে যেন মশা পালনের আয়োজন!
সরকারের ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান, ডেলমনে উল্টো চিত্র—পচা পানিতে মশার ‘রাজত্ব’