আয়েশা আক্তার
কুমিল্লা নগরীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যেন অবহেলা আর অদক্ষতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বছরের পর বছর ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকা এসব সড়ক এখন লাখো মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ জীবনঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন, কিন্তু যেন দেখার কেউ নেই।
সড়ক তিনটি নগরীর টমছম ব্রিজ থেকে কোটবাড়ি বিশ্বরোড পর্যন্ত সড়ক, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন সড়ক এবং ধর্মপুর-ঝাঁগুরঝুলি সড়ক। এগুলো শুধু নগরীর ব্যস্ততম সড়কই নয়, কুমিল্লা শহরের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথও। অথচ প্রায় পাঁচ বছর ধরে এসব সড়কের দুরবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে।
সড়ক নয়, যেন মৃত্যুফাঁদ: সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের অধিকাংশ অংশে পিচ উঠে গেছে। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও উঠে এসেছে ইট-পাথরের খোয়া। সামান্য বৃষ্টিতেই গর্তগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। তখন কোনটি রাস্তা আর কোনটি গর্ত, তা বোঝার উপায় থাকে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহী ও রিকশাচালকদের জন্য এসব সড়ক এখন আতঙ্কের নাম। অনেকেই পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছেন, আবার অনেকে যানবাহনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি কষ্টে রোগীরা সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ভাঙাচোরা সড়কের কারণে তাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে যায়।
রোগী নাজমা বেগম বলেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালে আসতে গিয়ে রাস্তার ঝাঁকুনিতে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ি। মনে হয়, হাসপাতালে নয়, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছি।
আরেক রোগী হান্নান বলেন, জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসতে গিয়ে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়। অ্যাম্বুল্যান্সও দ্রুত চলতে পারে না। এমন রাস্তা মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্স গর্ত এড়াতে ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হয়, যা সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরের প্রাণকেন্দ্রেও একই চিত্র, এই সড়কগুলো ব্যবহার করে প্রতিদিন যাতায়াত করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা সেনানিবাস, বিজিবি সেক্টর সদর দপ্তর,বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, র্যাব কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাশরিফ সুলতানা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো এই সড়কে চলাচল করতে ভয় পায়। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। মনে হয় না, এই সড়কের কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ আছে।পর্যটনের প্রবেশদ্বারও এখন দুর্ভোগের প্রতীক
ময়নামতি জাদুঘর, শালবন বৌদ্ধ বিহারসহ কোটবাড়ির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে যাওয়া-আসার অন্যতম প্রধান সড়ক এটি। দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটক প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু বেহাল সড়ক নগরীর ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
যানবাহন চালকদের ক্ষোভ, কোটবাড়ি এলাকার সিএনজিচালক আমজাদ বলেন, গর্তে পড়ে প্রতিদিন গাড়ির কোনো না কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের ওপর রাগ ঝাড়েন। বছরের পর বছর ধরে এমন অবস্থা চলছে।
আরেক চালক আবদুর রহমান বলেন, মাঝে একবার কিছু ভাঙা ইট আর কংক্রিট ফেলে দায়সারা মেরামত করা হয়েছিল। এখন সেগুলোও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।
নগরবাসীর প্রশ্ন, এত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বছরের পর বছর সংস্কারহীন পড়ে আছে কেন? বারবার সংস্কারের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, টমছম ব্রিজ থেকে কোটবাড়ি বিশ্বরোড পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কসহ বেহাল সড়কগুলো সংস্কারের জন্য টেন্ডারের আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে।
স্থানীয়রা দাবি করে বলেন , শুধু আশ্বাস নয়, তারা এখন দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান। কারণ পাঁচ বছর ধরে একই প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে তারা ক্লান্ত।
জনদুর্ভোগের দায় কার? প্রশ্ন উঠেছে, লাখো মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কগুলো বছরের পর বছর সংস্কারহীন থাকার দায় কে নেবে? কেন দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি? কেন রোগী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে?
কান্দির পাড় ব্যবসায়ি কল্যান সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব রোটারিয়ান মো আবদুর রহমান দাবি করে বলেন, দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করে অবিলম্বে তিনটি সড়কের সংস্কারকাজ শুরু করা হোক। কারণ একটি উন্নয়নশীল শহরের প্রবেশপথ যদি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে সেটি শুধু অবকাঠামোগত ব্যর্থতাই নয়, বরং জনভোগান্তির প্রতি চরম অবহেলারও প্রতিচ্ছবি।