প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 13 Aug 2026, 8:20 AM
এক নামে সরকারি চাকুরি, অন্য নামে জমি কেনার অভিযোগ নাঙ্গলকোটের শিক্ষিকার বিরুদ্ধে
এক নামে সরকারি চাকুরি, অন্য নামে জমি কেনার অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাকুরির নথিতে জন্মতারিখ ১৯৮০ সাল হলেও পাসপোর্টে তা ১৯৬৩। এর সঙ্গে রয়েছে সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পাসপোর্ট করা ও ইতালি ভ্রমণের অভিযোগ। পরিচয়, জন্মতারিখ ও সম্পত্তির দলিলের এমন একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মাইরাগাঁও মন্নাফ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনোয়ারা আক্তারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
বিভাগীয় মামলার নথি অনুযায়ী, আনোয়ারা আক্তারের চাকুরির নথি ও জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ৮ মার্চ ১৯৮০। অথচ তাঁর পাসপোর্টে জন্মতারিখ ২ জানুয়ারি ১৯৬৩।
একই ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিতে জন্মসনের ব্যবধান প্রায় ১৭ বছর। শুধু তাই নয়, অভিযোগসংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁর বড় ছেলের জন্মসন ১৯৮৩ উল্লেখ রয়েছে। ফলে জন্মতারিখের এই পার্থক্য নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।১৯৯৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সময়কার তথ্যও বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। তিনি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের বাকগ্রাম কাজী আহমদ আলী হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর এসএসসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০৪৯০১৪/১৯৯৪/৯৫ বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পাসপোর্টের জন্মতারিখ ১৯৬৩ সাল হলে ১৯৯৮ সালে তাঁর বয়স প্রায় ৩৫ বছর। অন্যদিকে চাকুরির নথিতে জন্মতারিখ ১৯৮০ সাল হলে একই সময়ে বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১৮ বছর। ফলে কোন তথ্যের ভিত্তিতে এসএসসি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাকরির নথিতে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল—এখন সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন?
‘আনোয়ারা’ চাকুরিতে, ‘জাহানারা’ জমির দলিলে
বিভাগীয় মামলার অভিযোগে সম্পত্তি ক্রয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আনোয়ারা আক্তার নামে সরকারি চাকুরিতে থাকলেও কয়েকটি সম্পত্তির দলিলে ‘মোসা. জাহানারা আক্তার ভুলু’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
অভিযোগনামায় ২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির ১৭০৭/১৩ নম্বর দলিল, একই বছরের ২২ অক্টোবরের ৯৭২১/১৩ নম্বর দলিল এবং ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বরের ৮৭৭০/১৯ নম্বর দলিলের উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ সালে ৯৭২১/১৩ নম্বর দলিলে তিন ডিং এবং ২০১৯ সালে ৮৭৭০/১৯ নম্বর দলিলে আরও তিন ডিং জমি ‘জাহানারা’ নামে কেনা হয়েছে।
এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—আনোয়ারা আক্তার ও ‘জাহানারা আক্তার ভুলু’ কি একই ব্যক্তি? যদি একই ব্যক্তি হন, তাহলে সরকারি চাকুরির নথির বাইরে অন্য নামে সম্পত্তি কেনার কারণ কী? আর যদি আলাদা ব্যক্তি হন, তাহলে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক কী?
সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ২০১৪ সালের ২৩ মার্চ আনোয়ারা আক্তার পাসপোর্ট করেন। পাসপোর্ট নম্বর বিএ-০৭০৩৯২৭।এর পর ২০১৫ সালে তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ইতালি ভ্রমণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি কর্মচারী হিসেবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং পাসপোর্টে ব্যবহৃত জন্মতারিখের ভিত্তি কী ছিল—এসব বিষয়ও বিভাগীয় তদন্তে যাচাই হওয়ার কথা।
জন্মতারিখ পরিবর্তনের কথা ও অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ারা আক্তার নিজের বক্তব্যে বলেন, তাঁর প্রকৃত জন্ম ১৯৬৩ সালে। চাকুরিতে প্রবেশের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও এসএসসি সনদে ১৯৮০ সাল করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, আমার স্বামী সিরাজুল ইসলাম এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর গ্রামের সবাই মিলে আমাকে এই স্কুলে চাকুরি দেন। চৌদ্দগ্রামের কাজী আহমদ আলী হাই স্কুল থেকে ১৯৯৮ সালে আমার জন্মতারিখ ১৯ বছর বানিয়ে আমার ভাই জসিম উদ্দিন আমাকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। তখন আমার বয়স ৩০ বছর ছিল। আমার প্রকৃত জন্ম ১৯৬৩ সালে। চাকুরির জন্য এনআইডি ও এসএসসি সনদে ১৯৮০ সাল করেছি।
জমি কেনা এবং মেয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘জাহানারা’ নাম ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আনোয়ারা ও জাহানারা—দুটিই আমার নাম।
মাইরাগাঁও মন্নাফ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর শিক্ষকগণ বলেন,২০২৫ সালে তদন্ত আসার পর বিষয়টি আমরা জানতে পারি। এলাকার মানুষজন তাঁকে স্কুলে খুঁজতে এলে জাহানারা নামেই ডাকেন।তিনি আরও জানান, ওই শিক্ষকের বেতন চলমান রয়েছে।
নাঙ্গলকোট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, উনার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ হয়েছিল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমি ও আমার দুজন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সহ তদন্ত করেছি।তদন্তের রিপোর্ট জেলায় পাঠিয়ে দিয়েছি।
কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনছুর আলী চৌধুরী বলেন, সাবেক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তাপস কুমার পাল তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী উনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেন।উক্ত বিভাগীয় মামলার প্রেক্ষিতে গত ৩০/১৩/২০২৫ তারিখে শুনানি হয়।এরপর তিনি পি আর এল এ চলে যাওয়ায় মামলাটি এমনি পরে আছে।বিষয়টি আমি জেনেছি। নতুন করে আবার তদন্ত করবো।
তবে এই বিষয়ে আনোয়ারার নিকট থেকে আমরা জানতে পারি যে, মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী আব্দুস সাত্তারের কে ১৫ লক্ষ টাকা দেন।আব্দুস সাত্তার আর্থিক লেনদেনের কারণে এই বিভাগীয় মামলার ফাইলটি গোপন বা সরিয়ে রাখেন এবং তাঁকে বলেন আপনি দাপটের সাথে চাকুরী করেন। আপনার চাকুরী ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা হলে তার দায় আমার এবং আমি তা দেখে নিব।আপনি যতদিন পারেন চাকুরী করে যান। আর এজন্যই বিভাগীয় মামলা হওয়ার পরেও এখানো তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যাবস্থা গ্রহণ করেনি এবং তাঁর বেতন ভাতাদিও বন্ধ হয়নি।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা, দেশের ৯ নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টির আশঙ্কায় ৯টি অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরকে ১ নম্বর (পুনঃ) সতর...
কুমিল্লায় গ্যাস সংকট, রাত জেগে রান্না—চরম ভোগান্তিতে আবাসিক...
মাহফুজ নান্টু কুমিল্লাকুমিল্লায় তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। গত এক সপ্তা...
ব্রাহ্মণপাড়ায় খেলার ছলে পুকুরে ডুবে ১৮ মাসের শিশুর মৃত্যু
মো. আনোয়ারুল ইসলামকুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় পুকুরের পানিতে ডুবে জাকিয়া আক্তার নামের ১৮ মাস বয়সী...
নাঙ্গলকোটে নিখোঁজের ৫দিন পর অটোরিকশা চালক মেহেদি হাসানের...
সাইফুল ইসলামকুমিল্লা নাঙ্গলকোটে নিখোঁজের ৫দিন পর ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালকমেহেদি হাসানের (১৮) অর...
বিজিবির অভিযানে ৪১ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাচালানী পণ্য জব্দ
মো. আনোয়ারুল ইসলাম।।কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ৪১ লাখ ৫২ হাজা...
চৌদ্দগ্রামে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট সহ পৃথক দুর্ঘটনায় নারী সহ নিহত ৩
এমরান হোসেন বাপ্পিকুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সাপের কামড়, সড়ক দুর্ঘটনা ও বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট সহ পৃথকতিনটি দুর্...