প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: জাতীয় | প্রকাশ: 19 Oct 2026, 9:33 AM
কুমিল্লায় মাউশি পরিচালকের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
আয়েশা আক্তার
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের দায়িত্ব নিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা কর্মকর্তাদের। কিন্তু সেই পরিদর্শনই যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক মো. শহিদ উল্লা মজুমদারের বিরুদ্ধে উঠেছে পরিদর্শনের নামে ‘সম্মানি’র আড়ালে অর্থ দাবির গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগের তির তাঁর নেতৃত্বাধীন পরিদর্শন দলের সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের দিকেও। এ ঘটনায় কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রথমে নানা বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ, বকাঝকা ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এরপর সহকারী পরিদর্শকের মাধ্যমে ‘সম্মানি’র নামে অর্থ দাবি করা হয়। কোথাও ৪০ হাজার টাকা, কোথাও ১০ হাজার টাকা—এমন অর্থ দাবির অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে অভিযুক্ত সহকারী পরিদর্শক এসব অভিযোগকে মিথ্যা, হাস্যকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
মাউশির কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ের আওতাধীন কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর জেলার ২৯৩টি স্কুল-কলেজের প্রধানদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়া অধ্যাপক মো. শহিদ উল্লা মজুমদার চলতি মাসে বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন শুরু করেন। এর পরপরই তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ সামনে আসে।
অনুসন্ধানে অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর পরিচালক অধ্যাপক মো. শহিদ উল্লা মজুমদারের নেতৃত্বে উপপরিচালক মোহাম্মদ সফিকুর রহমান, গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম ও সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে যান। অভিযোগ রয়েছে, পরিদর্শনের শুরুতেই প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। পরে সহকারী পরিদর্শকের মাধ্যমে ‘সম্মানি’র নামে অর্থ চাওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ‘আ’ আদ্যক্ষরের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা দেন। বাকি টাকা পরে দেওয়ার আশ্বাস দেন। ‘ন’ ও ‘ব’ আদ্যক্ষরের আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব লেনদেনের প্রমাণ গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
শুধু পরিদর্শনের দিনই নয়, বরুড়া উপজেলায় যাওয়ার আগেও ফোন করে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ১০ হাজার টাকা করে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম পাওয়া গেলে অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে—এমন কথাও বলা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের ভাষ্য।
লাকসামের গণ উদ্যোগ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।প্রতিষ্ঠানটির দাতা সদস্য আবুল কালাম মজুমদারের অভিযোগ, দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ম্যানেজিং কমিটি এক শিক্ষককে বহিষ্কার করেছিল। ওই বিষয়ে তদন্তে গিয়ে পরিচালক অধ্যক্ষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করেই অধ্যক্ষকে নিয়ে শিক্ষকদের সামনে কটূক্তি করা হয়।
আবুল কালাম মজুমদার বলেন, পরিদর্শন দলটি বেলা সোয়া ৩টার দিকে প্রতিষ্ঠানে আসে এবং সন্ধ্যা ৭টার দিকে বের হয়। এ সময় শিক্ষকদের একটি কক্ষে বসিয়ে পরীক্ষার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। পরে তাঁর সামনেই সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন অধ্যক্ষের কাছে অর্থ দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে ৩২ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এ সময় অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ৩২ হাজার টাকা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। পরে ২০ হাজার টাকা দিলেও হবে বলে জানানো হয়।নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুটি কলেজের অধ্যক্ষ ও একটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, দীর্ঘ চাকরিজীবনে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কখনোই হইনি। তাঁদের দাবি, প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাগজপত্র যাচাইয়ের আগেই দুর্ব্যবহার করা হয়, এরপর সহকারী পরিদর্শকের মাধ্যমে অর্থ চাওয়া হয়।
এক প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ভাষায়, চাকরি করি, তাই বাধ্য হয়ে দিতে হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তাঁরা বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও পেশাগত হয়রানির আশঙ্কায় প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে অনেকে ভয় পাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, পরিদর্শনের নামে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের পক্ষে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন,এসব অভিযোগ সঠিক নয়, হাস্যকর। আমাদের টিমের কাজ কি টাকাপয়সা নেওয়া? আমাদের বিপদে ফেলতে এসব করা হচ্ছে।পরবর্তী সময়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, পরিচালক অধ্যাপক মো. শহিদ উল্লা মজুমদারের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানদের প্রশ্ন—পরিদর্শনের নামে অর্থ দাবির অভিযোগের প্রতিকার কোথায়? আর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সময় কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায় নগরবাসী
আয়েশা আক্তারকুমিল্লা নগরীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের বেপরোয়া চলাচল, যানজট এবং একের পর এক দ...
এক সপ্তাহের মধ্যে বাখরাবাদ গ্যাস শ্রমিক-কর্মচারী সংসদের নির্...
নিজস্ব প্রতিবেদকবাখরাবাদ গ্যাস শ্রমিক-কর্মচারী সংসদ রেজি. নং-১৯৩৩ (সিবিএ)-এর বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ...
কুমিল্লায় বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির বার্ষিক সা...
ফজলুল হক জয়কুমিল্লায় বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতি (বাইপ্রমাস) এর জেলা শাখার বার্ষিক সাধারণ স...
আলহাজ্ব জুনাব আলীর নাতি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সাব্বিরের ইন্তেকাল
নিজস্ব প্রতিবেদককুমিল্লার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও দানবীর প্রয়াত আলহাজ্ব জুনাব আলীর কন্যা মোছাম্মৎ পেয...
ব্রাহ্মণপাড়ায় দুই মামলায় ১৫ ও ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ডাকাত গ্র...
মো. আনোয়ারুল ইসলামকুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় ১৫ ও ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে...
যুবদল নেতা কাউছার হত্যা পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা, দুই ভাইয়ের...
মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা।কুমিল্লা মহানগরীর ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদল নেতা মো. আবু কাউছার হত্যা মামলায় পাঁচ...